মো: আব্দুল্লাহ মামুন সোহান,চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
শারদীয় দুর্গোৎসবে ব্যতিক্রমী সাজে সেজেছেন দেবী দুর্গা। শাড়ির পরিবর্তে দেবীর পরনে ত্রিপুরা নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘রিনাই-রিসা’, গলায় রুপার চন্দ্রাহার ও পয়সা দিয়ে তৈরি মালা, কানে ঐতিহ্যবাহী দুল এবং হাতে-পায়ে রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতির নানা অলংকার। খাগড়াছড়ি জেলা সদরের খাগড়াপুর সার্বজনীন দুর্গামণ্ডপে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরতেই এই বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে।
আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) প্রকাশিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু দেবী দুর্গা নন, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকেও সাজানো হয়েছে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অলংকারে। মণ্ডপের প্রবেশপথ, মঞ্চ এবং সাজসজ্জাতেও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পাহাড়ের প্রকৃতি ও ত্রিপুরা সংস্কৃতির স্বকীয়তা।
পোশাক ও অলংকারে ত্রিপুরা সংস্কৃতির পরিচয়
দেবী দুর্গার পরনে রয়েছে ‘রিনাই-রিসা’। গলায় শোভা পাচ্ছে রুপার চন্দ্রাহার ও পয়সা দিয়ে তৈরি ‘পুইসা মালা’। খোঁপায় রয়েছে সুরাম ও কালসি, কানে ‘য়াংকুং’, হাতে ‘বাংগ্রী’ এবং পায়ে ‘বেংকি’। এসব ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অলংকার ত্রিপুরা নারীদের সংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রচলিত সাজসজ্জার বাইরে এমন আয়োজন দেখতে পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দেবী দুর্গার পাশাপাশি অন্য দেবদেবীদেরও একই ধারায় সাজানোয় পুরো মণ্ডপে ফুটে উঠেছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য।
ঐতিহ্য ধরে রাখার উদ্যোগ
খাগড়াপুর সার্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক চামেলী ত্রিপুরা জানান, নিজেদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই এ আয়োজন করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর অনেক ঐতিহ্য সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই দুর্গাপূজার মতো বড় ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে নিজস্ব পোশাক ও অলংকারের পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা।
কমিটির উদ্যোগে কয়েক বছর ধরে দেবী দুর্গাকে ত্রিপুরা নারীদের ঐতিহ্যবাহী সাজে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি পূজামণ্ডপেও ভিন্ন মাত্রা যোগ হচ্ছে।
মণ্ডপসজ্জায় পাহাড়ের প্রকৃতি
খাগড়াপুর পূজামণ্ডপে শুধু প্রতিমার সাজেই নয়, মঞ্চ ও প্রবেশপথের নকশাতেও পাহাড়ের প্রকৃতি তুলে ধরা হয়েছে। প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে সাজসজ্জা করায় মণ্ডপটি দর্শনার্থীদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বিনোদন ত্রিপুরা ও জ্যাক ত্রিপুরা জানান, ঐতিহ্যবাহী রিনাই-রিসা, চন্দ্রাহার ও অন্যান্য অলংকারে দেবী দুর্গাকে দেখতে তাঁদের ভালো লাগছে। তাঁদের মতে, এমন আয়োজন নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও দৃশ্যমান করে এবং নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে উৎসাহিত করে।
ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য
দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তবে খাগড়াপুরের এ আয়োজন দেখাচ্ছে, একই ধর্মীয় উৎসবকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে উদযাপন করতে পারে। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর পোশাক, অলংকার ও প্রকৃতিনির্ভর মণ্ডপসজ্জা সেই বৈচিত্র্যেরই একটি উদাহরণ।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় ৬৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত।
ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সাজে দেবী দুর্গার এই উপস্থাপন ধর্মীয় উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণের বার্তাও দিচ্ছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম নিজেদের শিকড়, পোশাক ও অলংকারের ঐতিহ্য সম্পর্কে আরও আগ্রহী হয়ে উঠবে।
Google News-এ Press Point BD-এর খবর দেখুন আমাদের সর্বশেষ সংবাদ ও প্রতিবেদন Google News-এ পড়ুন।














