আহমেদ সিয়াম:
সরবরাহ সংকট ও বাড়তি দামে এমনিতেই অস্থির দেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার। এর মধ্যে দুই দিনের ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়ে সরকারের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠন। তবে ধর্মঘটের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর চেষ্টা হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সচিবালয়ে এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ধর্মঘট করে পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না। প্রয়োজনে ১৯৫৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও উপস্থিত ছিলেন।
কমিশন বৃদ্ধি, হয়রানি বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে দুই দিনের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ এলপি গ্যাস ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির ঘোষণা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধ থাকবে।
[wpidcode Id= '3013']
ব্যবসায়ীদের এ সিদ্ধান্তে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভোক্তাদের মধ্যে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমনিতেই চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দিয়েও সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ধর্মঘট শুরু হলে সংকট আরও বাড়তে পারে।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার পাশাপাশি জ্বালানি সংগ্রহেও নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এরপরও সরকার দেশের বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ কমানোর চেষ্টা করছে।
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনগণের আস্থায় নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব মানুষের ভোগান্তি কমানো। ব্যবসায়ীদের কোনো দাবি থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। ধর্মঘট করে সরবরাহ বন্ধ রাখা কিংবা দাম বাড়ানোর চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
১৯৫৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে ধর্মঘটের ঘোষণা ঘিরে সরকারের কঠোর অবস্থান নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
এদিকে এলপিজির বাজারে চলমান অস্থিরতার পেছনে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ একাধিক কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং আমদানি অর্থায়নের জটিলতায় এলপিজি আমদানির খরচ বেড়েছে। একই সময়ে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদাও বাড়ছে।
কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের আমদানি ও সরবরাহ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় কোনো কোনো এলাকায় সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আবার সরবরাহ সংকটের সুযোগে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে।
এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওমেরা জানিয়েছে, ব্যাংকিং জটিলতা ও আমদানি অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে কয়েকটি বড় অপারেটর স্বাভাবিক আমদানি কার্যক্রম চালাতে পারছে না। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা নিয়মিত আমদানি অব্যাহত রাখলেও অন্য প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারের বাড়তি চাহিদার চাপ সামলাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে আইগ্যাসের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে জাহাজ চলাচল এবং আমদানি ব্যয় বেড়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে কত দিন লাগবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অক্টোবরে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ দামের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি বাড়তি ব্যয়ের চাপও পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কমিশন বৃদ্ধি ও হয়রানি বন্ধের দাবিতে তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন। অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, দাবি আদায়ের নামে সরবরাহ বন্ধ রেখে ভোক্তাদের দুর্ভোগে ফেলা যাবে না।
এখন সরকারের হুঁশিয়ারির পর ব্যবসায়ীরা ধর্মঘটের সিদ্ধান্তে অনড় থাকবেন, নাকি আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাবেন, সেটিই দেখার বিষয়। তবে দুই পক্ষের বিরোধের মধ্যে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন সাধারণ ভোক্তারাই।
Google News-এ Press Point BD-এর খবর দেখুন
আমাদের সর্বশেষ সংবাদ ও প্রতিবেদন Google News-এ পড়ুন।
https://news.google.com/search?q=site%3Apresspointbd.com&hl=bn&gl=BD&ceid=BD%3Abn
















