স্বাস্থ্য ডেস্ক: (নাবিলা কবির: নিজস্ব প্রতিবেদক): কোলেস্টেরের কারণ ও লক্ষণ।
কোলেস্টেরল হলো মোমের মতো এক ধরনের চর্বিযুক্ত পদার্থ, যা আমাদের শরীর সঠিকভাবে কাজ করার জন্য এবং হরমোন উৎপাদনে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। মেডিকভার হাসপাতাল, তেলেঙ্গানা
এটি যকৃৎ বা লিভারে তৈরি হয় এবং আমরা যে খাবার খাই তার মাধ্যমেও শরীরে প্রবেশ করে।
তবে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে তা হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কোলেস্টেরলের ধরন
কোলেস্টেরল মূলত দুই প্রকার..
- ১. এলডিএল (LDL - Low-Density Lipoprotein): একে 'খারাপ' কোলেস্টেরল বলা হয়। এটি রক্তনালীর দেওয়ালে জমে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, যার ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
- ২. এইচডিএল (HDL - High-Density Lipoprotein): একে 'ভালো' কোলেস্টেরল বলা হয়। এটি অতিরিক্ত কোলেস্টেরল যকৃতে ফিরিয়ে নিয়ে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে।
উচ্চ কোলেস্টেরল নির্ণয়
- মোট কলেস্টেরল
- কোলেস্টেরল এলডিএল
- কোলেস্টেরল এইচডিএল
- ট্রাইগ্লিসেরাইডস
কোলেস্টেরলের ঝুঁকি

যখন শরীরে 'খারাপ' কোলেস্টেরলের মাত্রা মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পায় এবং 'ভালো' কোলেস্টেরল কমে যায়, তখন ধমনী সংকুচিত হয়ে atherosclerosis নামক সমস্যা দেখা দেয়।
এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক এবং ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করে।
অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বংশগত কারণ, ধূমপান এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
কোলেস্টেরলের চিকিৎসা বা প্রতিকার
রক্তে উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল ধরা পড়লে প্রথমেই জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসার মূল লক্ষ্য থাকে 'এলডিএল' এর মাত্রা কমানো।
নিয়মিত ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ধরনের ব্যায়াম (যেমন হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সাঁতার কাটা)
এইচডিএল (ভালো কোলেস্টেরল) বাড়াতে সাহায্য করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমালে রক্তে ক্ষতিকর চর্বির মাত্রা স্বাভাবিক হয়।
ধূমপান বর্জন: ধূমপান রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ভালো কোলেস্টেরলের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
ওষুধ: জীবনযাত্রার পরিবর্তনেও যদি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে চিকিৎসকরা 'স্ট্যাটিন' (Statins) জাতীয় ওষুধ প্রেসক্রাইব করে থাকেন।
স্ট্যাটিনস: এটি লিভারে কোলেস্টেরল তৈরির প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেয়, ফলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা দ্রুত কমে। (যেমন: এটোরভাস্ট্যাটিন, রোসুভাস্ট্যাটিন ইত্যাদি)।
অ্যাসিড বেম্পেডোইক: এটি স্ট্যাটিনের মতো কাজ করলেও যাদের স্ট্যাটিন খেলে পেশীতে ব্যথা হয়, তাদের জন্য এটি বেশ কার্যকর।
রেজিন যা পিত্ত অ্যাসিডকে আবদ্ধ করে: এই ওষুধগুলো লিভারের তৈরি পিত্ত এসিডের সাথে যুক্ত হয়ে শরীর থেকে তা বের করে দেয়, যা পরোক্ষভাবে রক্তে কোলেস্টেরল কমায়।
PCSK9 ব্লকার: এটি আধুনিক এক ধরনের ইনজেকশন-ভিত্তিক ওষুধ, যা লিভারের খারাপ কোলেস্টেরল শোষণের ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মূলত বংশগত উচ্চ কোলেস্টেরল রোগীদের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত।
যে খাবারগুলো এড়িয়ে চলা উচিত

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে খাদ্যাভ্যাস থেকে ক্ষতিকর ফ্যাট বা চর্বিযুক্ত খাবারগুলো কঠোরভাবে বর্জন করা উচিত। যেমন:
স্যাচুরেটেড ফ্যাট (Saturated Fat): খাসির মাংস, গরুর মাংস, কলিজা এবং অন্যান্য রেড মিট এড়িয়ে চলা ভালো।
এছাড়া ফুল ফ্যাট দুধ, মাখন, ঘি এবং পনিরের ব্যবহার সীমিত করতে হবে।
ট্রান্স ফ্যাট (Trans Fat): এটি স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। ফাস্ট ফুড (বার্গার, পিজা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই), পেস্ট্রি,
কেক, এবং প্যাকেটজাত বিস্কুটে ট্রান্স ফ্যাট থাকে। এছাড়া বাজারের ভাজাপোড়া এবং ডুবোতেলে ভাজা খাবার বর্জন করা জরুরি।
প্রসেসড মিট: সসেজ, বেকন এবং হট ডগের মতো প্রক্রিয়াজাত মাংসে উচ্চমাত্রার সোডিয়াম ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে,
যা হৃদযন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
উচ্চ কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার: ডিমের কুসুম অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত এবং অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।
সুস্থ জীবনযাপনের জন্য খাবারে ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার (যেমন ওটস, শাকসবজি, ফলমূল, ডাল)
এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত খাবার (যেমন সামুদ্রিক মাছ) বেশি করে রাখা উচিত।
সচেতনতা এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসই পারে কোলেস্টেরলের ঝুঁকি থেকে আমাদের সুরক্ষিত রাখতে।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য
উচ্চ কোলেস্টেরল থাকলে কী হবে?
ধমনীতে প্লেক জমে যাওয়া (এথেরোস্ক্লেরোসিস): রক্তে ক্ষতিকর বা খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) বেড়ে গেলে তা ধমনীর ভেতরের দেওয়ালে চর্বির স্তর বা প্লেক (Plaque) হিসেবে জমা হতে শুরু করে।
রক্ত প্রবাহে বাধা: ধমনী সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কারণে হৃদপিণ্ড ও শরীরের অন্যান্য অংশে স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয়।
বুকে ব্যথা (Angina): রক্তনালী সংকুচিত হয়ে হৃদপিণ্ডে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও রক্ত না পৌঁছানোর কারণে বুকে চাপ বা ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি: ধমনী অতিরিক্ত সংকুচিত বা ব্লক হয়ে গেলে হার্ট অ্যাটাক অথবা ব্রেনে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে স্ট্রোকের মতো মারাত্মক জীবনঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ: রক্তনালীগুলো শক্ত ও সরু হয়ে যাওয়ার ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়।
কিভাবে কোলেস্টেরল কমাতে পারি?
আঁশযুক্ত বা ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার বেশি খান: ওটস, বার্লি, ডাল, শিম, ফলমূল এবং সবুজ শাকসবজি গ্রহণ করুন। দ্রবণীয় ফাইবার (Soluble Fiber) পরিপাকতন্ত্রে কোলেস্টেরল শোষণ কমিয়ে দেয়।
স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট: রেড মিট (গরু ও খাসির মাংস), প্রসেসড খাবার, ডুবো তেলে ভাজা খাবার, মাখন ও ঘি খাওয়া বন্ধ বা সীমিত করুন।
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট গ্রহণ করুন: রান্নায় সাধারণ তেলের বদলে অলিব অয়েল বা সয়াবিন তেল ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া বাদাম (যেমন কাঠবাদাম, আখরোট) এবং সামুদ্রিক মাছ (ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ) ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করে।
কোলেস্টেরলের লক্ষণগুলি কী কী?
উচ্চ কোলেস্টেরলের লক্ষণগুলি প্রায়ই নীরব থাকে তবে হৃদরোগ বা স্ট্রোকের মতো গুরুতর অবস্থার কারণ হতে পারে।
এথেরোস্ক্লেরোসিসের মতো জটিলতার কারণে বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা বা পায়ে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রাকৃতিকভাবে কোলেস্টেরলের মাত্রা পরিচালনা করার উপায়?
- দিনে অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো, সাঁতার কাটা বা সাইকেল চালানোর মতো ব্যায়াম করুন।
- শরীরচর্চা রক্তে 'ভালো' কোলেস্টেরলের (HDL) মাত্রা বাড়ায় এবং 'খারাপ' কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে সাহায্য করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ ও ধূমপান বর্জন
- অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা ৪-৫ কেজি কমাতে পারলেও কোলেস্টেরলের মাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
- ধূমপান ছেড়ে দিন। ধূমপান বন্ধ করলে রক্তনালীর কার্যক্ষমতা বাড়ে এবং HDL বা ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা দ্রুত উন্নতি করে।
কোলেস্টেরে যে খাবারগুলি এড়ানো উচিত
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করতে, স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট এবং কোলেস্টেরল বেশি থাকে এমন খাবার এড়িয়ে চলুন।
এর মধ্যে রয়েছে চর্বিযুক্ত মাংস , পূর্ণ চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত এবং ভাজা খাবার।
পরিবর্তে, চর্বিহীন প্রোটিন, গোটা শস্য এবং স্বাস্থ্যকর চর্বিগুলির মতো উচ্চ-কোলেস্টেরলযুক্ত খাবারগুলিতে ফোকাস করুন যা হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি করে।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন
রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা যদি অনেক বেশি থাকে, তবে শুধু খাদ্যাভ্যাস দিয়ে দ্রুত কমানো সম্ভব না-ও হতে পারে।
সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে স্ট্যাটিনস (Statins) বা অন্য কোনো ওষুধ শুরু করলে কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব দ্রুত ও নিরাপদে নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
-প্রেসপয়েন্টবিডি/ম্বাস্থ্য













