রজোবৃত্তি বা মেনোপজ কি?

প্রেসপয়েন্ট বিডি

প্রকাশ :জুলাই ২৫, ২০২৬

রজোবৃত্তি বা মেনোপজ কি?

স্বাস্থ্য ডেস্ক: (নাবিলা কবির: নিজস্ব প্রতিবেদক): রজোবৃত্তি বা মেনোপজ কি?

রজোবৃত্তি বা মেনোপজ (Menopause) নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক জৈবিক প্রক্রিয়া।

সাধারণত নারীর শরীরের ডিম্বাশয় থেকে ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন হরমোনের উৎপাদন ধীরে ধীরে হ্রাস পাওয়ার কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়।

সহজ কথায়, যখন একজন নারীর মাসিক বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তখন তাকে রজোবৃত্তি বা মেনোপজ বলা হয়।

সাধারণত টানা ১২ মাস বা এক বছর কোনো পিরিয়ড না হলে চিকিৎসকরা একে মেনোপজ হিসেবে নিশ্চিত করেন।

মেনোপজের প্রকারভেদ

মেনোপজ সব মহিলার ক্ষেত্রে একইভাবে ঘটে না। বয়সের সাথে সাথে এটি স্বাভাবিকভাবেই ঘটতে পারে অথবা চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার বা স্বাস্থ্যগত অবস্থার কারণেও হতে পারে। বিভিন্ন ধরণের মেনোপজের মধ্যে রয়েছে:

প্রাকৃতিক মেনোপজ

এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরণ এবং একজন মহিলার বৃদ্ধির সাথে সাথে ধীরে ধীরে ঘটে।

৪৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে যখন ডিম্বাশয় পর্যাপ্ত পরিমাণে ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন উৎপাদন বন্ধ করে দেয় তখন এটি ঘটে।

সার্জিক্যাল মেনোপজ

এটি তখন ঘটে যখন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে উভয় ডিম্বাশয় অপসারণ করা হয় অথবা oophorectomy হিস্টেরেক্টমির সময়।

হরমোন হঠাৎ কমে যাওয়ার ফলে, মহিলারা স্বাভাবিক মেনোপজের চেয়ে বেশি তীব্র লক্ষণ অনুভব করতে পারেন।

অকাল মেনোপজ

যখন ৪০ বছর বয়সের আগে মেনোপজ হয়, তখন তাকে অকাল মেনোপজ বলা হয়। এটি জিনগত কারণ, অটোইমিউন রোগ

বা কিছু চিকিৎসাগত অবস্থার কারণে হতে পারে।

পেরিমেনোপজ (মেনোপজ ট্রানজিশন)

মেনোপজের আগের পর্যায় হল যখন মাসিক অনিয়মিত হয়ে যায় এবং গরম ঝলকানি, মেজাজের পরিবর্তন

এবং ঘুমের সমস্যার মতো লক্ষণগুলি শুরু হয়।

পোস্ট মেনোপজ

এই ধরণের রোগটি একজন মহিলার ১২ মাস ধরে পিরিয়ড না থাকার পর দেখা দেয়।

এখানে, লক্ষণগুলি দেখা নাও দিতে পারে তবে অস্টিওপোরোসিস এবং হৃদরোগ বৃদ্ধি.

প্ররোচিত মেনোপজ

কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি বা ডিম্বাশয়ের ক্ষতি করে

এবং হরমোন উৎপাদন বন্ধ করে দেয় এমন ওষুধের মতো চিকিৎসার কারণে প্ররোচিত মেনোপজ হয়।

প্রারম্ভিক মেনোপজ

প্রাথমিক মেনোপজ ৪০ থেকে ৪৫ বছর বয়সের মধ্যে, গড় বয়সসীমার চেয়ে আগে ঘটে।

এটি স্বাভাবিক হতে পারে অথবা অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসার কারণে হতে পারে।

সময়কাল

সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে নারীদের মেনোপজ শুরু হয়।

তবে অনেকের ক্ষেত্রে এর আগে বা পরেও এটি হতে পারে।

এই সময়টিকে বলা হয় পেরিমেনোপজ (Perimenopause), যা মেনোপজের কয়েক বছর আগ থেকেই শুরু হতে পারে

এবং এটি পরিবর্তনের একটি দীর্ঘ পর্যায়।

মেনোপজের লক্ষণসমূহ

নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক জৈবিক প্রক্রিয়া

মেনোপজের সময় নারীদের শরীরে নানা রকম শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয়।

সবার ক্ষেত্রে সব লক্ষণ প্রকাশ পায় না, তবে সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

হট ফ্ল্যাশ ও ঘাম:

হঠাৎ করে শরীরে প্রচণ্ড গরম অনুভূত হওয়া, বিশেষ করে মুখ ও বুকে, এবং অতিরিক্ত ঘাম হওয়া।

অনিয়মিত মাসিক:

মেনোপজের আগের বছরগুলোতে মাসিকের চক্র অনিয়মিত হয়ে যাওয়া।

ঘুমের ব্যাঘাত:

রাতে ঠিকমতো ঘুম না হওয়া বা ইনসোম্নিয়া।

মুড সুইং বা মানসিক অস্থিরতা: খিটখিটে মেজাজ, অতিরিক্ত উদ্বেগ, বিষণ্ণতা বা হঠাৎ মন খারাপ হওয়া।

শারীরিক পরিবর্তন:

যোনিতে শুষ্কতা, ওজন বৃদ্ধি, ত্বকের সতেজতা কমে যাওয়া এবং হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস পাওয়া (অস্টিওপোরোসিস)।

মেনোপজ কোনো রোগ নয়, তাই এর সম্পূর্ণ নিরাময়ের প্রয়োজন নেই। এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক অধ্যায়।

তবে এর লক্ষণগুলো কমানো এবং সুস্থ জীবনযাপন নিশ্চিত করার জন্য কিছু ব্যবস্থাপনা নেওয়া যেতে পারে:

সুষম খাদ্য গ্রহণ:

ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, যা হাড় ও শরীরের শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে।

নিয়মিত ব্যায়াম:

হাঁটা, যোগব্যায়াম বা হালকা শারীরিক পরিশ্রম মেজাজ ভালো রাখে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন:

ধূমপান ও অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা অ্যালকোহল পরিহার করা।

চিকিৎসকের পরামর্শ:

লক্ষণগুলো তীব্র হলে চিকিৎসকের পরামর্শে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (HRT) বা অন্যান্য ওষুধ গ্রহণ করা যেতে পারে।

সচেতনতা

আমাদের সমাজে মেনোপজ নিয়ে এখনো এক ধরণের নীরবতা ও লজ্জাবোধ কাজ করে।

অনেক নারী এই সময়কার মানসিক ও শারীরিক কষ্টগুলো নীরবে সহ্য করেন, যা তাদের জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দেয়।

তাই এ বিষয়ে পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।

এটি কোনো অসুস্থতা নয়, বরং নারীর জীবনের একটি নতুন রূপান্তর। স্বামী, সন্তান ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সহযোগিতা এবং সহানুভূতিশীল মনোভাব এই সময়ে নারীর মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।

সঠিক জ্ঞান, খাদ্যাভ্যাস ও ইতিবাচক মানসিকতার মাধ্যমে নারীরা এই পর্যায়টিকে সুন্দর ও সাবলীলভাবে পার করতে পারেন।

-প্রেসপয়েন্টবিডি/ম্বাস্থ্য

আরো পড়ুন..... 

কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ ও প্রতিরোধ

ফ্যাটি লিভার: লক্ষণ ও চিকিৎসা