মানব স্বাস্থ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

প্রেসপয়েন্ট বিডি

প্রকাশ :জুলাই ২৯, ২০২৬

মানব স্বাস্থ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

স্বাস্থ্য ডেস্ক: (নাবিলা কবির: নিজস্ব প্রতিবেদক): মানব স্বাস্থ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান যুগের অন্যতম ভয়াবহ বৈশ্বিক সংকট। এটি কেবল আমাদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং মানবস্বাস্থ্যের ওপর ফেলছে সুদূরপ্রসারী ও ক্ষতিকর প্রভাব।

তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। অ্যাপোলো হাসপাতাল, দিল্লি

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিক অবস্থানের দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি অগ্রভাগে রয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধিতে তাপমাত্রা

মানব স্বাস্থ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব হলো বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রার চরম বৃদ্ধি। তীব্র তাপপ্রবাহ বা হিটওয়েভ মানুষের শরীরকে দ্রুত কাবু করে ফেলে।

এর ফলে হিটস্ট্রোক, তীব্র পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন), এবং হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

বিশেষ করে প্রবীণ, শিশু এবং বাইরে কাজ করা দিনমজুর ও কৃষকরা এই তাপপ্রবাহের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

এছাড়া আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো সরাসরি আঘাত, আঘাতজনিত মৃত্যু এবং লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতি বছর অতিরিক্ত প্রায় আড়াই লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে, যার প্রধান কারণ অপুষ্টি, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া এবং অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ।

বাংলাদেশে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত কয়েক দশকে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, কার্ডিওভাসকুলার বা হৃদরোগ এবং কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

বিশেষ করে বাইরে কাজ করা প্রান্তিক শ্রমিক এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠী এই তাপজনিত অসুস্থতার শিকার হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি।

মশাবাহিত ও পানিবাহিত রোগের বিস্তার

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উষ্ণতা ও বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মশাবাহিত রোগের বাহক বা ভেক্টরের প্রজননক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

আইসিডিডিআর,বি (icddr,b) এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপাত্ত বলছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর মৌসুম এখন আর নির্দিষ্ট বর্ষাকালে সীমাবদ্ধ নেই; বরং সারা বছরই এর প্রকোপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগের বিস্তার শহর থেকে মফস্বল ও গ্রামঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, ঘূর্ণিঝড়, আকস্মিক বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির উৎস লোনাপানিতে প্লাবিত হচ্ছে।

এর ফলে সৃষ্ট ডায়রিয়া, কলেরা এবং টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব শিশুস্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টিহীনতা

কৃষিবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা নির্দেশ করে যে, বারবার সংঘটিত খরা, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

ফলস্বরূপ, মানুষের পুষ্টির মান নিম্নমুখী হচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের

ফলে আগামীতে বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।

এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিশু ও নারীদের ওপর, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী অপুষ্টি, কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশু

এবং রক্তাল্পতার হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মানসিক স্বাস্থ্য এবং অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি

শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।

নদী ভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গৃহহীন হয়ে পড়া মানুষরা চরম অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা এবং পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD)-এর শিকার হচ্ছেন।

গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, পরিবেশগত বিপর্যয়ের ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতি মানুষের জীবনযাত্রার মানকে ভেঙে দেয় এবং মানসিক অবসাদের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

গবেষণালব্ধ তথ্য স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, জলবায়ু পরিবর্তন কেবল একটি পরিবেশগত সংকট নয়, এটি একটি ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটও বটে।

এই সংকট থেকে রক্ষায় স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নত করা, গবেষণা জোরদার করা

এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক পদক্ষেপকে দ্রুত বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য।

জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব মোকাবিলায় এখনই কার্যকর ও সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

স্বাস্থ্যসেবা খাতকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করতে হবে যাতে জলবায়ু-জনিত জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়া যায়।

একই সাথে কার্বন নিঃসরণ কমানো, পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন গড়ে তোলা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সংকট থেকে মানবজাতিকে সুরক্ষা দিতে হবে।

মানবস্বাস্থ্যের সুরক্ষার স্বার্থে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক।

-প্রেসপয়েন্টবিডি/ম্বাস্থ্য

আরো পড়ুন..... 

কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ ও প্রতিরোধ

ফ্যাটি লিভার: লক্ষণ ও চিকিৎসা

রজোবৃত্তি বা মেনোপজ কি?

জরায়ুমুখের ক্যানসার: সচেতনতা এবং প্রতিরোধ