বেলুচিস্তান কেন পাকিস্তান থেকে পৃথক হতে চায়?

প্রেসপয়েন্ট বিডি

প্রকাশ :জুলাই ২৩, ২০২৬

বেলুচিস্তান কেন পাকিস্তান থেকে পৃথক হতে চায়?
বেলুচ স্বাধীনতার সংগ্রাম ও ভূরাজনীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বেলুচিস্তান কেন পাকিস্তান থেকে পৃথক হতে চায়?

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে অন্যতম এক উত্তপ্ত ও সংবেদনশীল নাম বেলুচিস্তান।

আয়তনের দিক থেকে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হলেও, এখানকার মানুষের অধিকার ও মর্যাদা দীর্ঘ দিন ধরে চরম অবহেলিত। পাকিস্তানের আয়তনের প্রায় ৪৪% দখল করে রাখা এই অঞ্চলে স্বাধীনতার দাবি নতুন কিছু নয়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত ভাগের সময় থেকেই সংঘাতের সূচনা, যা বিগত কয়েক দশকে রূপ নিয়েছে এক সশস্ত্র সংশ্রমে।

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর একটি অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও কেন বেলুচরা মূল ভূখণ্ড পাকিস্তান থেকে পৃথক হতে চায়? ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনৈতিক বৈষম্য এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হলো।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্তির ক্ষত

বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার আকুতির মূল শিকড় প্রোথিত রয়েছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ইতিহাসের গভীরে।

কালাত রাজ্যের স্বাধীনতা:

ব্রিটিশ শাসনামলে বেলুচিস্তানের সিংহভাগ এলাকা ‘কালাত রাজ্য’ (State of Kalat) হিসেবে স্বশাসিত অঞ্চল ছিল।

১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট কালাতের খান বা শাসক আনুষ্ঠানিকভাবে কালাতকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।

পাকিস্তানের সংযুক্তি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ:

পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের মার্চে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী এবং জিন্নাহ সরকারের রাজনৈতিক চাপে কালাতের খান পাকিস্তানের সংগে অন্তর্ভুক্তির চুক্তিতে সই করতে বাধ্য হন।

প্রথম বিদ্রোহ:

কালাতের খানের ভাই এই সিদ্ধান্ত মেনে না নিয়ে পাহাড়ের ঢালে সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দেন, যা ছিল বেলুচ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম অধ্যায়।

বেলুচদের দৃষ্টিতে এই সংযুক্তি ছিল একতরফা ও অগণতান্ত্রিক।

অর্থনৈতিক শোষণ ও সম্পদের বৈষম্য

বেলুচিস্তান কেন পাকিস্তান থেকে পৃথক হতে চায়?

বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ, কিন্তু একই সাথে এটি প্রাকৃতিক সম্পদে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ।

এই চরম বৈপরীত্যই বেলুচ অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ।

প্রাকৃতিক গ্যাসের বঞ্চনা:

১৯৫২ সালে বেলুচিস্তানের ‘সুই’ (Sui) অঞ্চলে বিশাল গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। পুরো পাকিস্তানের বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় বহু দশক ধরে এই গ্যাস ব্যবহৃত হলেও বেলুচিস্তানের বেশিরভাগ অঞ্চল শতবর্ষ ধরে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

খনিজ সম্পদের অপব্যবহার:

রেকো দিক (Reko Diq) ও সাইনদাক (Saindak) অঞ্চলের কোটি কোটি ডলার মূল্যের সোনা, তামা ও খনিজ সম্পদ তোলা হলেও এর সামান্য অংশই রাজস্ব বা উন্নয়ন খাতে বেলুচিস্তানে ফেরত আসে।

চরম দারিদ্র্য ও বেকারত্ব:

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বেলুচিস্তানের ৭০ শতাংশেরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, অথচ এখান থেকেই কেন্দ্র কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় করে।

রাজনৈতিক বৈষম্য ও পাঞ্জাবি আধিপত্য

রাজনৈতিক বৈষম্য ও পাঞ্জাবি আধিপত্য

বেলুচদের একটি প্রধান অভিযোগ হলো, পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণভাবে পাঞ্জাবি জাতিগোষ্ঠী ও সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের নিয়ন্ত্রণে।

         [ পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসক ও সামরিক বলয় ]

                             │

            ┌────────────────┴────────────────┐

            ▼                                 ▼

   [ সম্পদ ও রাজস্ব আহরণ ]           [ স্থানীয় অধিকার দমন ]

   • সুই গ্যাস ও খনিজ সম্পদ          • রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন অস্বীকার

   • সিপেক (CPEC) ও গোয়াদার          • গুম ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান

  • স্বায়ত্তশাসনের অভাব: ১৯৭০-এর দশকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সময়ে বেলুচিস্তানের নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার বাতিল করা হলে সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
  • সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রান্তিকতা: বেলুচদের বাদ দিয়ে ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডি থেকে তাঁদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। এতে সাধারণ বেলুচদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে, তাঁরা নিজ দেশেই রাজনৈতিকভাবে বন্দি।

সিপেক (CPEC) ও গোয়াদার বন্দর সংকট

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) বেলুচ বিদ্রোহীদের আরও উসকে দিয়েছে।

গোয়াদার বন্দরের বাস্তবচিত্র: বেলুচিস্তানের গোয়াদার শহরে চীন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করেছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই বন্দরের মূল সুবিধা পাচ্ছে চীন ও পঞ্জাবি বানিয়ারা।

এমনকি মৎস্যজীবীরা নিজেদের উপকূলেই মাছ ধরতে বাধা পাচ্ছেন, আর বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট এখনো রয়ে গেছে।

বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের ভয়, চীন ও পাকিস্তানের এই যৌথ প্রকল্প তাঁদের ভূখণ্ডে ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ (জনসংখ্যাগত পরিবর্তন) ঘটাবে এবং বেলুচরা নিজ মাতৃভূমিতেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে।

মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুমের রাজনীতি

বিগত দুই দশকে বেলুচিস্তানে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি ও তাদের অপশাসন বহুগুণে বেড়েছে।

১. বলপূর্বক গুম (Enforced Disappearances): বেলুচ অ্যাক্টিভিস্ট, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার হাজার হাজার অভিযোগ রয়েছে।

২. নবাব আকবর বুগতির হত্যাকাণ্ড (২০০৬): পাকিস্তানের প্রাক্তন জেনারেল পারভেজ মোশাররফের শাসনামলে বেলুচ নেতা ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক নবাব আকবর বুগতিকে এক সামরিক অভিযানে হত্যা করা হয়।

এই ঘটনা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে আরও বহুগুণে ত্বরান্বিত করে।

৩. 'কিল অ্যান্ড ডাম্প' নীতি: অপহৃত ব্যক্তিদের গুলিবিদ্ধ লাশ বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ি এলাকা বা রাস্তার পাশে পাওয়া গেছে, যা বেলুচ তরুণ সমাজকে অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য করেছে।

সশস্ত্র সংগ্রাম ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি

বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (BLA), বেলুচিস্তান লিবারেশন ফ্রন্ট (BLF) সহ বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন বর্তমানে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী ও চীনা প্রকল্পের ওপর ঘনঘন হামলা চালাচ্ছে।

ইরান, আফগানিস্তান ও ভারতের সংগে ভূরাজনৈতিক সমীকরণ বেলুচিস্তান সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

পাকিস্তান বারবার অভিযোগ করে আসছে যে বহিঃশক্তি বেলুচ বিদ্রোহীদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে, তবে বেলুচ নেতাদের দাবি, এ লড়াই তাঁদের বাঁচা-মরার ও স্বাধিকারের লড়াই।

ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ও পরিচয় সংকট

বেলুচরা আশঙ্কা করছে যে সিপেক এবং বহিরাগতদের (বিশেষ করে পাঞ্জাবি ও সিন্ধি ব্যবসায়ী) আগমনের ফলে তারা নিজ ভূখণ্ডেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে।

নিজেদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় টিকিয়ে রাখতে তারা একটি স্বাধীন বেলুচ রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করে।

শিক্ষা ও অবকাঠামোগত অবহেলা

পাকিস্তানের সবচেয়ে ধনী ভূখণ্ড হওয়া সত্ত্বেও এখানে সাক্ষরতার হার এবং স্বাস্থ্যসেবার মান সবচেয়ে নিচে। অধিকাংশ গ্রামীণ এলাকায় স্কুল, হাসপাতাল কিংবা পাকা রাস্তার কোনো অস্তিত্ব নেই।

জাতীয় বাজেটের সিংহভাগই অন্যান্য প্রদেশে ব্যয় করা হয়, যা বেলুচ তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বঞ্চনাবোধ তৈরি করেছে।

উপসংহার

বেলুচিস্তান সংকট মূলত ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ঐতিহাসিক ভুল, সামাজিক বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক জটিল যোগফল।

কেবল সামরিক অভিযান চালিয়ে বা "সন্ত্রাসবাদ" ট্যাগ লাগিয়ে শত বছরের জাতিগত স্বাধিকার ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার ক্ষোভ দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

যতক্ষণ না পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার বেলুচদের প্রকৃত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করবে এবং তাদের মানবাধিকার সমুন্নত রাখবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বেলুচিস্তানের পৃথক হওয়ার এই আওয়াজ স্তব্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

সাধারণ জিজ্ঞাসাবলী (FAQ)

বেলুচিস্তান কি কখনো স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল?

হ্যাঁ, ১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর কালাতের খান আনুষ্ঠানিকভাবে কালাতকে (বর্তমান বেলুচিস্তানের বড় অংশ) স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করেছিলেন। তবে ১৯৪৮ সালের মার্চে পাকিস্তান বাহিনীর চাপে এটি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।

পাকিস্তানের কত শতাংশ ভূখণ্ড বেলুচিস্তানের অন্তর্গত?

বেলুচিস্তান আয়তনের দিক থেকে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। এটি পাকিস্তানের মোট আয়তনের প্রায় ৪৪% এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।

বিএলএ (BLA) বলতে কী বোঝায়?

বিএলএ বা বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি হলো একটি সশস্ত্র বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী। তারা পাকিস্তান থেকে বেলুচিস্তানের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য পাকিস্তানি সেনা, সরকারি অবকাঠামো এবং চীনের অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলোর ওপর আক্রমণ চালিয়ে থাকে।

সিপেক (CPEC) নিয়ে বেলুচদের মূল আপত্তি কী?

বেলুচদের দাবি, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর থেকে অর্জিত কোনো মুনাফা স্থানীয় বেলুচদের উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে না।

উপরন্তু, বিদেশি ও অ-বেলুচদের আগমনের ফলে তাঁরা নিজেদের জন্মভূমিতেই অদূর ভবিষ্যতে সংখ্যালঘু হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন।

পাকিস্তানের গ্যাস সরবরাহে বেলুচিস্তানের অবদান কী?

পাকিস্তানের 'সুই' গ্যাসক্ষেত্র বেলুচিস্তানেই অবস্থিত, যা বহু বছর ধরে পাকিস্তানের শিল্প ও আবাসিক খাতের মূল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে আসছে।

অথচ বেলুচিস্তানের বেশিরভাগ জেলা এখনো পাইপলাইনের গ্যাস সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।

-প্রেসপয়েন্টবিডি/ম্বাস্থ্য

-প্রেসপয়েন্টবিডি/ম্বাস্থ্য

আরো পড়ুন....সাই পল্লবীর বাড়ির অন্দরমহল: অন্দরসজ্জা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

ভারতে ছাত্র আন্দোলনে মোদী সরকারকে চ্যালেঞ্জ