হাম ও উপসর্গে ৪ শিশুর মৃত্যু: নতুন আক্রান্ত ৯১৭ জন

প্রেসপয়েন্ট বিডি

প্রকাশ :সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬

হাম ও উপসর্গে ৪ শিশুর মৃত্যু: নতুন আক্রান্ত ৯১৭ জন

নাবিলা কবির: দেশজুড়ে উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে সংক্রামক রোগ হামের প্রাদুর্ভাব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত চব্বিশ ঘণ্টায় হাম এবং এর জটিল উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ৯১৭ জন। চলতি মৌসুমে এটিই এক দিনে সর্বোচ্চ সংক্রমণের রেকর্ড।

হঠাৎ এই সংক্রমণ বৃদ্ধিতে হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা।

স্বাস্থ্য বিভাগের মহামারি নিয়ন্ত্রণ শাখা ও বিভিন্ন জরিপের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু।

মৃত ৪ শিশুর সবার বয়সই ৯ মাস থেকে ৩ বছরের মধ্যে।

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ও ক্লিনিক্যাল অডিট অনুযায়ী, সরাসরি হামের ভাইরাসের চেয়ে হাম-পরবর্তী সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন

বা তীব্র নিউমোনিয়া এবং মস্তিস্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে হামজনিত জটিলতায় মৃত্যুর ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি।

সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য জরিপ ও বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস)-এর তথ্যমতে,

দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) সামগ্রিক কভারেজ সন্তোষজনক হলেও হাম ও রুবেলা (এমআর) টিকার প্রথম ডোজের পর

দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ব্যবধান থেকে যাচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রথম ডোজের কভারেজ যেখানে প্রায় ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে দ্বিতীয় ডোজের ক্ষেত্রে তা নেমে আসে প্রায় ৭৪ থেকে ৭৬ শতাংশে।

অর্থাৎ প্রায় ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ শিশু পূর্ণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থেকে যাচ্ছে।

বিশেষ করে চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, পাহাড়ি জনপদ এবং শহরাঞ্চলের ভাসমান বস্তিগুলোতে এ ড্রপ-আউটের হার আরও বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফের যৌথ মূল্যায়ন প্রতিবেদন বলছে, হাম সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে কমিউনিটি পর্যায়ে অন্তত ৯৫ শতাংশ হার্ড ইমিউনিটি বা টিকাদানের পূর্ণ কভারেজ প্রয়োজন।

বর্তমান পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে, নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক ক্লাস্টারে টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের মূল উৎস।

সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের এক জরিপে উঠে এসেছে, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৬৭ শতাংশই এমআর টিকার একটি ডোজও পায়নি

কিংবা কেবল একটি ডোজ পেয়েছিল।

সংক্রমণের বিস্তার রোধে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত বিশেষ সার্ভিল্যান্স বা নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে বাদ পড়া শিশুদের চিহ্নিত করে ‘মপ-আপ’ টিকাদান কার্যক্রম অবিলম্বে শুরু করতে হবে।

পাশাপাশি আক্রান্ত প্রতিটি শিশুকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো নিশ্চিত করা আবশ্যক, যা মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।

জনসচেতনতার ঘাটতিও সংক্রমণের গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে,

প্রায় ৪৩ শতাংশ অভিভাবক হামের প্রাথমিক লক্ষণকে সাধারণ মৌসুমী জ্বর ভেবে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন।

ফুসকুড়ি ওঠার আগেই তীব্র জ্বর ও চোখ লাল হওয়া অবস্থায় আক্রান্ত শিশুকে জনসমাগম থেকে আলাদা না রাখায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

হাম কোনো সাধারণ মৌসুমী রোগ নয়; এটি একটি মারাত্মক ও অত্যন্ত সংক্রামক ব্যাধি হলেও শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য।

বর্তমান পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, টিকাদানের ব্যবধান দূর না করলে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।

ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি, ভ্রাম্যমাণ টিকাদান টিম গঠন

এবং আক্রান্ত শিশুদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসার আওতায় এনে দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

আরো পড়ুন......

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবার পেল বিআরটিএর অনুদান