পার্বত্য চট্টগ্রামে ম্যালেরিয়ার উপদ্রব

প্রেসপয়েন্ট বিডি

প্রকাশ :আগস্ট ৭, ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রামে ম্যালেরিয়ার উপদ্রব

স্বাস্থ্য ডেস্ক: (নাবিলা কবির: নিজস্ব প্রতিবেদক): পার্বত্য চট্টগ্রামে ম্যালেরিয়ার উপদ্রব।

বাংলাদেশ থেকে ম্যালেরিয়া প্রায় বিদায় নিলেও পাহাড়ি জনপদে এটি এখনও একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়

দেশের মোট ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর সিংহভাগই কেন্দ্রীভূত রয়েছে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলায়।

ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু এবং জীবনযাত্রার ভিন্নতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ সহজে কমছে না, যা স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক কারণ

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, গভীর জঙ্গল এবং দীর্ঘ বর্ষাকাল অ্যানোফিলিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

এখানকার পাহাড়ি ঝরনা, খাড়াল ও জমে থাকা বৃষ্টির পানি মশার প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে।

এছাড়া ভৌগোলিকভাবে মিয়ানমার ও ভারতের মিজোরাম সীমান্তবর্তী হওয়ায় এই অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ ও পরজীবীর বিস্তার তুলনামূলক বেশি থাকে।

বিশেষ করে বর্ষাকালে পাহাড়ি অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার বিস্তার মারাত্মক রূপ ধারণ করে।

সংকটের পেছনে মূল কারণসমূহ

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ের গবেষকদের মতে, পাহাড়ে ম্যালেরিয়া দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে:

সচেতনতার অভাব: দুর্গম এলাকার অনেক জাতিগোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষ ম্যালেরিয়ার লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নন।

সামান্য জ্বর হলে তারা স্থানীয় ওঝা-বৈদ্যের শরণাপন্ন হন অথবা অবহেলা করেন, যার ফলে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু হয় না।

মশারির ব্যবহার কমে যাওয়া: অতীতে বিনামূল্যে কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ করা হলেও বর্তমানে এর সঠিক ও নিয়মিত ব্যবহার অনেকের মধ্যেই কমে গেছে।

তাছাড়া এসব মশারির কার্যকারিতা নিয়েও কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে।

যোগাযোগের সমস্যা: পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আধুনিক চিকিৎসাসেবার ঘাটতির কারণে রোগীরা অনেক সময় সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না।

জুম চাষ বা বনাঞ্চলে রাত কাটানোর সময় মশার কামড় থেকে সুরক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকাও সংক্রমণের একটি বড় কারণ।

জনজীবন ও অর্থনীতিতে প্রভাব

ম্যালেরিয়ার কারণে পাহাড়ি অঞ্চলের জনজীবন প্রায়ই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে বর্ষার মৌসুমে যখন জুম চাষ ও পাহাড়ি কৃষিকাজের ব্যস্ততা থাকে, ঠিক তখনই ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ে।

এতে খেটে খাওয়া মানুষ ও কৃষকরা বেশি আক্রান্ত হন।

বারবার ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়ে।

অনেক সময় সঠিক চিকিৎসার অভাবে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে, যা পুরো পরিবারকে গভীর শোকে ডুবিয়ে দেয়।

উত্তরণের উপায় ও করণীয়

পার্বত্য অঞ্চল থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূল করতে হলে কেবল চিকিৎসাসেবা সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বরং বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:

১. নিয়মিত সচেতনতা বৃদ্ধি: দুর্গম পাড়ায় পাড়ায় উঠান বৈঠক ও উঠতি প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি ও লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। জ্বর হলেই দ্রুত রক্ত পরীক্ষা করানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

২. কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা: পাহাড়ি জনপদে নিয়মিত মানসম্মত কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি মশার প্রজনন রোধে লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখার ওপর জোর দিতে হবে।

৩. স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বিস্তার: দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ, দ্রুত রোগ নির্ণয়ের কিট এবং অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করা জরুরি।

৪. সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নজরদারি: প্রতিবেশী দেশের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথভাবে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালনা করা প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে পুরোপুরি ম্যালেরিয়ামুক্ত করা একটি দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হলেও অসম্ভব নয়।

সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই জনপদকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করতে।

সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ ও জনসচেতনতাই পারে পাহাড়ের মানুষকে এই মরণব্যাধির হাত থেকে সুরক্ষা দিতে।

-প্রেসপয়েন্টবিডি/ম্বাস্থ্য

আরো পড়ুন..... 

কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ ও প্রতিরোধ

ফ্যাটি লিভার: লক্ষণ ও চিকিৎসা

রজোবৃত্তি বা মেনোপজ কি?