ডেস্ক রিপোর্ট: চট্টগ্রাম প্রতিনিধি/(মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ মামুন সোহান): লোহাগাড়ায় বিনামূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্প।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে লোহাগাড়ায় বিনামূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্পের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এসময় সহযোগিতার জন্য পাশে ছিলো সাতকানিয়া-লোহাগাড়া মানবিক ফাউন্ডেশন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের জনজীবন।
টানা কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।
ঘরবাড়ি ডুবেছে, রাস্তাঘাট ভেঙেছে, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্য ঝুঁকি।
পানিবন্দি মানুষের মাঝে দেখা দিচ্ছে ডায়রিয়া, জ্বর, সর্দি, চর্মরোগ ও পানিবাহিত নানা অসুখ।
চিকিৎসা কেন্দ্র দূরে হওয়ায় এবং আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এমন প্রেক্ষাপটে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে মানবিক হাত বাড়িয়েছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার অন্যতম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাতকানিয়া-লোহাগাড়া মানবিক ফাউন্ডেশন।
বন্যা পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সংগঠনটির উদ্যোগে আগামী ৩১ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার লোহাগাড়া উপজেলায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দিনব্যাপী বিনামূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্প ও রক্তের গ্রুপ নির্ণয় কর্মসূচি।
বন্যা কবলিত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস

সাতকানিয়া-লোহাগাড়া মানবিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংগঠনটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্যোগে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আসছে।
ত্রাণ বিতরণ, শিক্ষা উপকরণ প্রদান, শীতবস্ত্র বিতরণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায়ও তাদের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।
সংগঠনের দায়িত্বশীলরা জানান, বন্যার পানি নেমে গেলেও তার রেশ থেকে যায় অনেকদিন। দূষিত পানি পান, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং বাসস্থানের অপরিচ্ছন্নতার কারণে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে।
বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক পরিবারই এখনো ঘর গোছাতে ব্যস্ত।
ফলে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ বা সামর্থ্য তাদের নেই।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ফাউন্ডেশন সিদ্ধান্ত নেয় এলাকায় গিয়েই মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার।
সংগঠনের এক সদস্য বলেন, "আমরা চাই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কোনো মানুষ যেন বিনা চিকিৎসায় কষ্ট না পায়।
আমাদের এই ছোট প্রয়াস যদি ১০ জন মানুষেরও উপকারে আসে, সেটাই আমাদের সার্থকতা।"
ক্যাম্পের স্থান ও সময়
বিনামূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্পটি অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ সাতকানিয়ার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গোলাম বারী সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম প্রাঙ্গণে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মানবিক এ উদ্যোগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
আগামী শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে এ ক্যাম্প। সকাল থেকেই রোগীদের নিবন্ধন শুরু হবে।
স্বেচ্ছাসেবকরা রোগীদের লাইন ও সেবা প্রদানে সহযোগিতা করবেন।
বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সমন্বয়ে সেবা
এবারের ক্যাম্পকে আরও ফলপ্রসূ করতে ৩ জন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক স্বেচ্ছায় সেবা দিতে সম্মত হয়েছেন। তারা বিনামূল্যে রোগী দেখবেন, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন এবং প্রাথমিক ওষুধ সরবরাহে সহযোগিতা করবেন।
ক্যাম্পে উপস্থিত থাকবেন:
১. ডা. জোবাইদা নাছরিন নিকা
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এফসিপিএস (গাইনী এন্ড অবস্) শেষ পর্ব, সিএমইউ (আল্ট্রাসনোগ্রাফি)।
তিনি গাইনী ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি বিশেষজ্ঞ এবং বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত।
বন্যা-পরবর্তী সময়ে নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যা ও গর্ভবতী মায়েদের বাড়তি ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে তার এখানে উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
২. ডা. যীশু নাথ
এমবিবিএস (চবি), পিজিটি (শিশু), এফসিপিএস (শিশু) পার্ট-২।
তিনি শিশু ও নবজাতক রোগ বিশেষজ্ঞ। বন্যার পর শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও অপুষ্টির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
শিশুদের সঠিক চিকিৎসা ও পুষ্টি পরামর্শ দিতেই তিনি ক্যাম্পে থাকবেন।
৩. ডা. মো. মুবিনুল ইসলাম
এমবিবিএস (সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ), এমএস (জেনারেল সার্জারী)।
তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের রেসিডেন্ট।
তিনি সার্জারি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, বাত-ব্যথা ও সাধারণ মেডিসিন বিষয়ে রোগীদের সেবা দেবেন। বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদী রোগীদের জন্য তার পরামর্শ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বিনামূল্যে ব্লাড গ্রুপ নির্ণয়
চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি ক্যাম্পে আগত সকলের বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা হবে।
স্বেচ্ছায় রক্তদানে আগ্রহী ও জরুরি প্রয়োজনে রক্তের গ্রুপ জানা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
এজন্য ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আলাদা বুথের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবকরা রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ে সহায়তা করবেন এবং তথ্য সংরক্ষণ করবেন।
সার্বিক সহযোগিতায়
এই মানবিক উদ্যোগের সার্বিক সহযোগিতা করছেন আলহাজ্ব মোস্তাক আহমেদ চৌধুরী।
তিনি সাতকানিয়া-লোহাগাড়া মানবিক ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা। তিনি বলেন, "দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়াবে এটাই স্বাভাবিক। ফাউন্ডেশনের এ উদ্যোগকে আমি সাধুবাদ জানাই।
ভবিষ্যতেও আমরা এ ধরনের মানবিক কাজে পাশে থাকবো।"
এছাড়াও ক্যাম্পের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সহযোগিতা করছেন।
সকলের প্রতি আহ্বান
সাতকানিয়া-লোহাগাড়া মানবিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বন্যাদুর্গত ও সুবিধাবঞ্চিত সকলকে ক্যাম্পে উপস্থিত হয়ে বিনামূল্যে সেবা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিশেষ করে যারা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত, যাদের বাড়িতে অসুস্থ শিশু, নারী ও বয়স্ক রয়েছেন তাদেরকে ক্যাম্পে আসার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানানো হয়।
সংগঠনের সভাপতি বলেন, "আমরা বিশ্বাস করি একসাথে কাজ করলে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা সম্ভব।
আপনারা সবাই আসুন, সেবা নিন এবং অন্যকেও আসতে উৎসাহিত করুন।"
উল্লেখ্য, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া মানবিক ফাউন্ডেশন একটি অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
২০১৮ সাল থেকে সংগঠনটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ মোকাবেলায় কাজ করে যাচ্ছে।
তাদের এ ধরনের উদ্যোগ ইতোমধ্যে এলাকায় বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বন্যার ক্ষত এখনো শুকায়নি। তবে মানবিক মানুষদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই ক্ষত একদিন ঠিকই সেরে উঠবে।
শুক্রবারের এ মেডিক্যাল ক্যাম্প তেমনই এক প্রয়াস।
-প্রেসপয়েন্টবিডি/রাজনীতি













