বিজ্ঞান-প্রযুক্তি: বিশ্বের সবচেয়ে বড় মরুভূমি যেখানে নেই বালু। ব্যাপারটা অদ্ভুদ হলেও সত্য।
এবার ভেবে দেখুন তো.. পৃথীবির বুকে এমন এক জায়গা আছে এখানে নেই কোন মাটি, নেই একমুঠো বালি।
‘মরুভূমি’ শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত তপ্ত ও রুক্ষ সোনালি বালুরাশি,
মাথার ওপর তীব্র তাপদাহ, তৃষ্ণার্ত প্রান্তর আর হয়তো পানির খোঁজে ঘুরে বেড়ানো ক্যারাভ্যান বা উটের কাফেলা।
ছোটবেলা থেকে গল্পের বই, সিনেমা কিংবা ভৌগোলিক ছবিতে মরুভূমিকে ঠিক এভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে আমাদের এমন পরিচিত ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার মতো একটি প্রাকৃতিক সত্য হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মরুভূমিতে কোনো বালু নেই! এমনকি সেখানে সূর্যের তীব্র তাপ তো দূরের কথা,
হিমাঙ্কের বহু নিচে থাকা প্রচণ্ড ঠান্ডায় মুহূর্তের মধ্যে রক্ত জমে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়।
বিজ্ঞানের চোখে মরুভূমি ?
মানুষ সাধারণ যেখানে তাপমাত্রা ও বালুর উপস্থিতি আছে সেই স্থানকে মরুভূমি হিসাবে চিহ্নিত করে।
পরিবেশবিজ্ঞান এবং ভূগোলের পরিভাষায় কোনো অঞ্চলের উষ্ণতা বা মাটির ধরন দেখে মরুভূমি নির্ধারণ করা হয় না,
বরং তা নির্ধারিত হয় বৃষ্টিপাত বা বার্ষিক বারিপাত (Precipitation)-এর পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।
অ্যান্টার্কটিকা:

অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশটি পৃথিবীর একেবারে দক্ষিণে বা দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত।
বৈরী আবহাওয়া ও চরম প্রতিকূল পরিবেশের কারণে এখানে কোনো স্থায়ী মানববসতি গড়ে ওঠেনি।
বিশাল আয়তন: অ্যান্টার্কটিকার মোট আয়তন প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ বর্গকিলোমিটার (বা প্রায় ৫.৫ মিলিয়ন বর্গমাইল)। এটি সমগ্র ইউরোপ মহাদেশের চেয়েও বড় এবং আয়তনে এশিয়া ও আফ্রিকার পরেই এর অবস্থান।
পৃথিবীর বিশুদ্ধ পানির আধার: এটি একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য যে, পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক অঞ্চলের বুকে জমে আছে পৃথিবীর মোট বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির (Freshwater) প্রায় ৭০ শতাংশ এবং মোট বরফের প্রায় ৯০ শতাংশ!
ম্যাকমুর্ডো ড্রাই ভ্যালি (McMurdo Dry Valleys): অ্যান্টার্কটিকার ভেতরে এমন কিছু নির্দিষ্ট উপত্যকা রয়েছে যেগুলোকে পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক জায়গা বলা হয়।
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, সেখানকার ‘ড্রাই ভ্যালি’ অঞ্চলে বিগত প্রায় ২০ লাখ বছর ধরে এক ফোঁটা বৃষ্টি বা তুষারপাতও হয়নি।
সেখানকার বাতাস এতটাই শুষ্ক যে মাটিতে কোনো আর্দ্রতা বা বরফের অস্তিত্বও টিকতে পারে না।
বরফের মহাদেশটি এত শুষ্ক ও মরুভূমি হলো কীভাবে?
সমুদ্রের জলে ঘেরা এবং বিশালাকার বরফের স্তূপে ঢাকা একটি মহাদেশ কীভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমি হতে পারে—এমন প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক।
এর নেপথ্যে রয়েছে চরম প্রাকৃতিক ও বায়ুমণ্ডলীয় তিনটি মূল কারণ:
১. বাতাসের চরম শীতলতা ও আর্দ্রতাহীনতা
পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, বাতাস যত বেশি গরম হয়, তার জলীয় বাষ্প ধারণ করার ক্ষমতা তত বাড়ে।
বিপরীতভাবে, বাতাস অতিমাত্রায় ঠান্ডা হলে তা আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না। অ্যান্টার্কটিকার তাপমাত্রা নিয়মিত $-৫০^\circ\text{C}$ থেকে $-৮০^\circ\text{C}$-এর নিচে অবস্থান করে।
এত কম তাপমাত্রায় বাতাসে আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্প তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব।
ফলে সেখানে মেঘ সৃষ্টি হতে পারে না এবং বৃষ্টি বা ভারী তুষারপাত ঘটে না।
২. শক্তিশালী মেরু উচ্চচাপ বলয় (Polar High-Pressure Systems)
অ্যান্টার্কটিকার বায়ুমণ্ডলে সার্বক্ষণিকভাবে একটি শক্তিশালী উচ্চ বায়ুচাপের বলয় বিরাজ করে। এই উচ্চচাপের কারণে ওপরের শুষ্ক বাতাস নিচের দিকে নেমে আসে।
ফলে জলীয়বাষ্পপূর্ণ বাতাস এই মহাদেশের ওপরে প্রবেশ করতে পারে না
এবং ঘন মেঘ জমে বৃষ্টি বা তুষার হওয়ার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
৩. ধ্বংসাত্মক ক্যাটাব্যাটিক বাতাস (Katabatic Winds)
অ্যান্টার্কটিকায় যে তীব্র গতিবেগের বাতাস প্রবাহিত হয় তাকে ‘ক্যাটাব্যাটিক বাতাস’ বলা হয়।
মহাদেশের ভেতরের উঁচু বরফের পর্বত থেকে মাধ্যাকর্ষণের টানে এই অত্যন্ত ঠান্ডা ও ঘন বাতাস উপকূলের দিকে নেমে আসে।
কখনো কখনো এই বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছায়।
এই বাতাস এতটাই শুষ্ক যে তা চলাচলের পথে থাকা যেকোনো সামান্যতম আর্দ্রতা বা তুষারকণাকেও বাষ্পীভূত বা উড়িয়ে নিয়ে যায়।
বিশ্বের শীর্ষ তিন মরুভূমির তুলনামূলক চিত্র
অনেকের মনেই প্রশ্ন আসতে পারে, সাহারা বা গোবি মরুভূমির সাথে অ্যান্টার্কটিকার পার্থক্য ঠিক কতখানি? নিচের ছকটি দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে:
| মরুভূমির নাম | ধরন/প্রকৃতি | আনুমানিক আয়তন | বার্ষিক গড় বারিপাত | প্রধান অবস্থান |
| ১. অ্যান্টার্কটিকা মরুভূমি | মেরু অঞ্চলের বরফ | ১,৪২,০০,০০০ বর্গকিমি | ৫০ মিমি-এর কম | দক্ষিণ মেরু |
| ২. আর্কটিক মরুভূমি | মেরু অঞ্চলের টুন্ড্রা | ১,৩৯,০০,০০০ বর্গকিমি | ১০০-২৫০ মিমি | উত্তর মেরু (আলাস্কা, কানাডা, রাশিয়া ইত্যাদি) |
| ৩. সাহারা মরুভূমি | উপক্রান্তীয় (গরম ও বালুময়) | ৯২,০০,০০০ বর্গকিমি | ১০০ মিমি-এর নিচে | উত্তর আফ্রিকা |
এই তালিকা স্পষ্ট করে দেয় যে, আফ্রিকায় অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম উষ্ণ মরুভূমি ‘সাহারা’ সামগ্রিক তালিকায় আসলে তৃতীয় স্থান অধিকার করে আছে।
শীর্ষ দুটি স্থানই বরফে ঢাকা দুই মেরু অঞ্চলের দখলে।
অ্যান্টার্কটিকা: বিজ্ঞানের এক প্রাকৃতিক সময়-যন্ত্র (Time Machine)

অ্যান্টার্কটিকার এই চরম শুষ্কতা, হিমশীতল আবহাওয়া এবং জনমানবহীন পরিবেশ একে বিজ্ঞানীদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গবেষণাগারে পরিণত করেছে।
মহাকাশের উল্কাপিন্ড সংরক্ষণ: মহাকাশ থেকে যেসব উল্কাপিন্ড (Meteorites) পৃথিবীতে এসে পড়ে, সেগুলোর সিংহভাগই অ্যান্টার্কটিকায় একদম অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়।
শুষ্ক ও বরফাচ্ছন্ন আবহাওয়া আবহাওয়াজনিত ক্ষয় (Weathering) রোধ করে, ফলে শত সহস্র বছর আগের উল্কাপিন্ডও এখানে অবিকৃত থাকে।
জলবায়ুর ইতিহাস উদঘাটন: অ্যান্টার্কটিকার ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার পুরু বরফের আস্তরের গভীরে ড্রিল (Drill) করে বরফের আইস কোর (Ice Core) নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
এই বরফের স্তরের ভেতর শত হাজার বছর আগের বায়ুমণ্ডলের বাতাস ও গ্যাসের বুদ্বুদ আটকে থাকে।
যা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর আবহাওয়া কেমন ছিল তা নিখুঁতভাবে বলতে পারেন।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মরুভূমি অ্যান্টার্কটিকা:
অনেকেই মনে করেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মরুভূমি হলো সাহারা। কিন্তু আসলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মরুভূমি হলো অ্যান্টার্কটিকা।
কেন অ্যান্টার্কটিকা মরুভূমি?
- মরুভূমি মানেই বালুর সমুদ্র নয়।
- মরুভূমির মূল বৈশিষ্ট্য হলো অত্যন্ত কম বৃষ্টিপাত। সাধারণত বছরে ২৫০ মিমি (১০ ইঞ্চি) এর কম বৃষ্টিপাত হলে সেই অঞ্চলকে মরুভূমি বলা হয়।
- অ্যান্টার্কটিকায় বছরে অনেক স্থানে ৫০ মিমি-এরও কম বৃষ্টিপাত (বা তুষারপাত) হয়, তাই এটি একটি শীতল মরুভূমি (Polar Desert)।
কিছু চমকপ্রদ তথ্য:
- আয়তন: প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ বর্গকিলোমিটার (১৪.২ মিলিয়ন কিমি²)
- তাপমাত্রা: শীতকালে −৮০°C-এরও নিচে নেমে যেতে পারে।
- ভূপ্রকৃতি: প্রায় ৯৮% এলাকা বরফে আচ্ছাদিত, তাই এখানে বালুর বিশাল টিলা নেই।
বিশ্বের বৃহত্তম মরুভূমিগুলো:
- অ্যান্টার্কটিকা (শীতল মরুভূমি)
- আর্কটিক মরুভূমি
- সাহারা (বিশ্বের বৃহত্তম উষ্ণ মরুভূমি)
উপসংহার
মরুভূমি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে অ্যান্টার্কটিকা আমাদের শেখায় যে, প্রকৃতির বৈচিত্র্য কতটা বিস্ময়কর হতে পারে।
সাহারার মতো বিশাল বালুকা রাশি কিংবা প্রখর রোদ ছাড়াও যে একটি মরুভূমি গড়ে উঠতে পারে এবং তা পুরো পৃথিবীর আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—অ্যান্টার্কটিকা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
তাই পরের বার যখন কেউ আপনাকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মরুভূমির কথা জিজ্ঞেস করবে,
তখন প্রখর রোদ আর বালুর সাহারা নয়; পৃথিবীর দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বরফাবৃত, নীরব ও রহস্যময় মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকার নামই স্বর্বাগ্রে উচ্চারিত হওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র: FOX Weather
-প্রেসপয়েন্টবিডি/প্রযুক্তি













