ডেঙ্গুর দাপট, স্বস্তি নেই হাসপাতালেও

প্রেসপয়েন্ট বিডি

প্রকাশ :সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬

ডেঙ্গুর দাপট, স্বস্তি নেই হাসপাতালেও

দেশে এক দিনে ১,৫৭১ রোগী ভর্তি, মৃত্যু ৯

নাবিলা কবির: দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ফের উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৭১ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ৯ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৫ হাজার ৪৭৫ জন; মৃত্যু হয়েছে ১৩০ জনের। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ২১৮ জন।

রাজধানীর পাশাপাশি খুলনা, চট্টগ্রাম ও বরিশালেও রোগীর চাপ বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগের হাসপাতালগুলোতে ৪০৮ জন, খুলনা বিভাগে ২৪২ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ভর্তি হয়েছেন ৩৩০ জন। এই সংখ্যা বলছে, ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সংকট নয়।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিভিল সার্জনদের ডেঙ্গু রোগীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভর্তি, প্রয়োজন অনুযায়ী ডেডিকেটেড শয্যা বাড়ানো এবং হাসপাতালের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার নির্দেশ দিয়েছে। রোগীদের মশারি ব্যবহারের বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে হাসপাতালে থেকেও সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট, স্যালাইন ও ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত রাখার চেষ্টা চলছে। কোনো হাসপাতালে ঘাটতি দেখা দিলে নিজস্ব বাজেট থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।

চিকিৎসকের কি বলছে

সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) মেডিসিন বিশেষজ্ঞ মেজর ডা. মারিয়া রহমান (এমবিবিএস, এমডি) সতর্ক করে বলেন, "এ বছর ডেঙ্গুর ধরন অত্যন্ত বিপজ্জনক। রোগীরা সাধারণ ফ্লু মনে করে ঘরে বসে থাকছেন, কিন্তু হঠাৎ করেই প্লাজমা লিকেজ হয়ে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে চলে যাচ্ছেন এবং ব্লাড প্রেশার মারাত্মকভাবে ড্রপ করছে। মানুষ প্লাটিলেট নিয়ে আতঙ্কে থাকে, কিন্তু আসল লড়াইটা ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট আর প্রেসার ধরে রাখার। ক্রমাগত বমি, পেটে তীব্র ব্যথা বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে এক সেকেন্ডও দেরি করা মানে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ানো।" তিনি আরও যোগ করেন, "সরকারি হাসপাতালে ট্রায়াজ ও ডেঙ্গু কর্নার কাজ করলেও আশঙ্কাজনক রোগীদের জন্য আইসিইউ ও এইচডিইউ শয্যার সংকট চরম।"

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডে মেঝেতে শুয়ে থাকা রোগী কামাল হোসেন বলেন, "চার দিন ধরে তীব্র জ্বর আর শরীর ব্যথা নিয়ে এসেছি। কোনো সিট নেই, মেঝেতেই চাদর বিছিয়ে স্যালাইন চলছে। ডাক্তাররা আসছেন, কিন্তু এত রোগীর ভিড়ে একেকজনের পেছনে দুই মিনিটের বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ তাঁদের নেই।"

সেখানেই চিকিৎসাধীন রোগীর মা রহিমা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমার ছেলের রক্তচাপ হঠাৎ নেমে গেছে, হাত-পা ঠান্ডা। নার্স ডাকলে পাওয়া যায় না, স্যালাইন শেষ হয়ে গেলে আমাদেরই দৌড়াতে হয়। ৫০ টাকার সরকারি টেস্ট করাতে লাইনেই চলে যায় অর্ধেক দিন। সরকারি হাসপাতালে ওষুধ কিছুটা পেলেও ল্যাব আর বেডের এই অবস্থা থাকলে রোগী বাঁচানো কঠিন।"
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ ও ডেঙ্গু হাসপাতালের সামনে রোগীর স্বজন তৌফিক এলাহী জানান, "আমার বড় ভাইকে ঢাকার বাইরের একটি হাসপাতাল থেকে রেফার করা হয়েছে। ঢাকার তিন-চারটা বড় হাসপাতাল ঘুরেছি, সব জায়গায় বলছে কোনো বেড খালি নেই। শেষ পর্যন্ত এখানে এনে কোনোমতে ভর্তি করতে পেরেছি, কিন্তু এইচডিইউ বেড এখনো পাইনি।"

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রোগী শায়লা আক্তার বলেন, "হাসপাতাল থেকে নরমাল স্যালাইন দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে সময়মতো ব্লাড প্রেশার বা পালস চেক করার লোক পাওয়া যায় না। রোগী একটু ভালো হলেও পরিবেশ দেখে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ার অবস্থা।"
সরকারিভাবে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি ৫০ টাকা নির্ধারণ এবং পর্যাপ্ত আইভি ফ্লুইড মজুতের নির্দেশ থাকলেও মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট ও শয্যার অভাব পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ তৈরি করেছে। দ্রুত শনাক্তকরণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত না হলে ডেঙ্গুর এই ধাক্কা সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা কি ভাবছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা সবগুলো একসঙ্গে চালাতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সমন্বিত সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে পুরুষ ৮৫১ জন এবং নারী ৪৬৩ জন। অর্থাৎ পুরুষ রোগীর হার প্রায় ৬৪.৮ শতাংশ, আর নারী রোগীর হার ৩৫.২ শতাংশ। বয়সভিত্তিক হিসাবে ২১–২৫ বছর বয়সী রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ২০৭ জন।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ ও অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। তাই এখনই হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক, স্যালাইন ও পরীক্ষার কিটের প্রস্তুতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন।

আরো পড়ুন...

সরকারি চাকরির ভাইবায় নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাবিতে বিক্ষোভ
এআইয়ের দিয়ে আশির দশকে ফিরছে মানুষ!