এআইয়ের দিয়ে আশির দশকে ফিরছে মানুষ!

প্রেসপয়েন্ট বিডি

প্রকাশ :সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬

জয়শ্রী রানী: একটি ছবি। সঙ্গে কয়েকটি নির্দেশনা। আর তাতেই যেন কয়েক দশক পেছনে ফিরে যাওয়া! কারও পরনে বেলবটম প্যান্ট, কারও চুলে আশির দশকের স্টাইল, কারও হাতে পুরোনো দিনের ক্যামেরা বা ‘ইটের মতো’ মোবাইল ফোন। ছবির পেছনে কখনো পুরোনো ডিস্কো, কখনো স্টুডিও সেট, আবার কখনো দেখা যাচ্ছে সেই সময়ের ঘরবাড়ি কিংবা রাস্তার আবহ। বাস্তবে সেই সময়ের মানুষ না হয়েও এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সাহায্যে নিজেদের আশির দশকের চরিত্রে কল্পনা করছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা।

সাম্প্রতিক সময়ে Instagram ও Facebook-এ নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘৮০-এর দশকের AI Photo Trend’। বর্তমান সময়ের ছবি এআই টুলে দিয়ে সেটিকে এমনভাবে রূপান্তর করা হচ্ছে, যেন ছবিটি সত্যিই ১৯৮০-এর দশকে তোলা। শুধু ছবিতে পুরোনো কোনো ফিল্টার বসিয়ে দেওয়া নয়; বরং পোশাক, চুলের ধরন, আনুষঙ্গিক জিনিস, আলো, ব্যাকগ্রাউন্ড এবং ছবির টেক্সচার সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে একটি সম্পূর্ণ রেট্রো আবহ।

এক ছবিতেই বদলে যাচ্ছে পুরো সময়কাল

এই ট্রেন্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, ব্যবহারকারীর মুখ ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য মোটামুটি অপরিবর্তিত রেখে পুরো দৃশ্যপটকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া। কেউ চাইছেন নিজেকে আশির দশকের সিনেমার নায়কের মতো দেখতে, কেউবা পুরোনো দিনের নায়িকার সাজে। আবার অনেকে সাধারণ পারিবারিক ছবিকে সেই সময়ের স্টুডিও ফটোগ্রাফের আদলে তৈরি করছেন।

এআইকে নির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়ে চুলের স্টাইল, পোশাক, পোজ, ব্যাকগ্রাউন্ড এমনকি ক্যামেরার ধরন পর্যন্ত কল্পনা করানো যাচ্ছে। ফলে আধুনিক একটি ছবি কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পেয়ে যাচ্ছে পুরোনো দিনের ফিল্ম ক্যামেরায় তোলা ছবির মতো আবহ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী বলছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই নতুন নতুন ট্রেন্ড চলে তবে ৮০’র দশকের এই ব্যাপার ভীষণ মজার। তারা আরো বলে, এআই আমাদের জীবন কতটা বদলে দিয়েছে। চাইলেই একটা ২০২৬ সালের ছবি ৮০’র দশকের হয়ে যাচ্ছে।

কেন এত জনপ্রিয় হচ্ছে?

প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি এই ট্রেন্ডের পেছনে কাজ করছে নস্টালজিয়া। আশির দশক অনেকের কাছে শৈশব, পুরোনো সিনেমা, গান, ফ্যাশন এবং পারিবারিক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যারা সেই সময় দেখেননি, তাঁরাও সিনেমা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে পরিচিত সেই যুগকে নিজেদের ছবিতে কল্পনা করার সুযোগ পাচ্ছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘Add Yours’ ধরনের ফিচারও ট্রেন্ডটি ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখছে। একজন ব্যবহারকারী নিজের রেট্রো ছবি প্রকাশ করার পর অন্যদেরও একই ধরনের ছবি তৈরির আহ্বান জানাতে পারছেন। ফলে এক ব্যক্তির ছবি থেকে শুরু হয়ে খুব দ্রুত সেটি বন্ধু, অনুসারী এবং বৃহত্তর অনলাইন কমিউনিটির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।

শুধু সাধারণ ব্যবহারকারী নয়, তারকারাও

এআইয়ের এই রেট্রো রূপান্তর সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন দেশের বিনোদন জগতের পরিচিত মুখও নিজেদের ৮০-এর দশকের লুকে উপস্থাপন করছেন। ভারতীয় টেলিভিশন অঙ্গনের বেশ কয়েকজন তারকা এআই-নির্মিত রেট্রো ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন। তাঁদের ছবিতে পুরোনো দিনের পোশাক, চুলের স্টাইল, পোজ এবং স্টুডিও ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবহার করা হয়েছে।

ব্রাজিলিয়ান টিভি ব্যক্তিত্ব, গায়িকা ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী Xuxa Meneghel ও এই ট্রেন্ডের সময়ে নিজের আশির দশকের পুরোনো ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন। তিনি মজার ছলে বোঝাতে চেয়েছেন, তাঁর ক্ষেত্রে আশির দশকের আবহ তৈরি করতে এআইয়ের প্রয়োজন নেই কারণ তিনি নিজেই সেই সময়ের অংশ ছিলেন।

এআই কি সত্যিই অতীত ফিরিয়ে আনছে?

অবশ্যই বাস্তব অর্থে অতীতে ফিরে যাওয়া নয়। তবে ছবি তৈরির প্রযুক্তি মানুষের কল্পনাকে এমনভাবে দৃশ্যমান করে তুলছে, যা আগে করতে আলাদা ফটোগ্রাফি সেটআপ, পোশাক, মেকআপ ও সম্পাদনার প্রয়োজন হতো।

এখন একটি সাধারণ ছবি এবং সঠিক নির্দেশনাই অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট। এআই সেই নির্দেশনা বিশ্লেষণ করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করতে পারে। ফলে প্রযুক্তি এখানে শুধু ছবি সম্পাদনার মাধ্যম নয়; বরং ব্যক্তিগত স্মৃতি ও কল্পনাকে নতুনভাবে উপস্থাপনের একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

তবে রয়েছে সতর্কতার জায়গাও

এআই দিয়ে তৈরি ছবি যত বাস্তবসম্মত হচ্ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ছবিটির প্রকৃত উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছ থাকা। একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি বা পরিবর্তিত ছবিকে যদি আসল ঐতিহাসিক ছবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সংবাদ, ইতিহাস বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে এআই-নির্মিত ভিজ্যুয়াল ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই কনটেন্ট শনাক্ত করার ব্যবস্থাও সবসময় নিখুঁত নয়। ফলে কোনো ছবি বাস্তব নাকি কৃত্রিমভাবে তৈরি তা নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ৮০-এর দশকের এই নতুন AI ট্রেন্ড দেখিয়ে দিচ্ছে প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের নস্টালজিয়াকেও ডিজিটাল বিনোদনে পরিণত করতে পারে। একদিকে পুরোনো সময়ের ফ্যাশন ও সংস্কৃতির প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে এআই হয়ে উঠছে ব্যক্তিগত কল্পনার এক নতুন ক্যানভাস।

সময়কে সত্যিকার অর্থে পেছনে ফেরানো সম্ভব নয়। কিন্তু একটি ছবির মাধ্যমে সেই সময়ের অনুভূতিটুকু কল্পনা করা এখন আর কঠিন নয়। আর সেই কারণেই হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজকের মানুষ একটু একটু করে ফিরে যাচ্ছেন আশির দশকে।

আরো পড়ুন...

সরকারি চাকরির ভাইবায় নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাবিতে বিক্ষোভ