নাবিলা কবির: গত দুই দশকে দ্রুত নগরায়ণের কারণে ঢাকা শহরের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি আদর্শ ও বাসযোগ্য শহরের মোট আয়তনের অন্তত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সবুজ বা গাছপালা থাকা প্রয়োজন।
তবে স্যাটেলাইটভিত্তিক একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে বর্তমানে সবুজের আচ্ছাদন নেমে এসেছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশে।
সবুজ ধ্বংসের এই ধারাবাহিকতায় আধুনিক ও পরিকল্পিত আবাসিক এলাকাগুলোও চরম হুমকির মুখে পড়ছে।
গাছ কেটে বহুতল ভবন আর কংক্রিটের রাস্তা তৈরির ফলে বাসিন্দারা সরাসরি পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার 'সি' ব্লকের বাসিন্দা ফরিদা ইয়াসমীন (৬৮)। দুই প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জননী
এবং দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় বসবাসকারী এই গৃহিণী নিজের চোখের সামনে এলাকাটির রূপবদল দেখেছেন। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন:
প্রায় পনেরো বছর আগে যখন আমরা এই এলাকায় আসি, তখন চারপাশ গাছপালা আর খোলা জায়গায় ভরা ছিল।
সকালে পাখির ডাক শোনা যেত, আর ঘরে শীতল হাওয়া খেলত। এখন চারপাশে শুধুই বহুতল ভবন। আমাদের ঘরের পাশের শেষ কৃষ্ণচূড়া গাছটাও কেটে ফেলা হয়েছে।
গাছ কমে যাওয়ায় গরম এতোটাই বেড়েছে যে সারা দিন এসি ছাড়া ঘরে থাকা যায় না। বয়সের কারণে শ্বাসকষ্টের সমস্যা শুরু হয়েছে, অথচ আগে বিকেলে একটু হেঁটে আসলেও শরীর জুড়িয়ে যেত।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘন গাছপালা না থাকায় তৈরি হচ্ছে 'আরবান হিট আইল্যান্ড' (Urban Heat Island) প্রভাব।
গাছপালা প্রস্বেদনের মাধ্যমে যে শীতলীকরণ প্রভাব তৈরি করত, তা নষ্ট হওয়ায় আশপাশের এলাকার চেয়ে তাপমাত্রা প্রায় ৩°C থেকে ৫°C পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে।
সবুজ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. আরিফ (এমএস) বলেন:
গাছ কাটার কারণে শুধু যে ছায়া কমছে তা নয়, এটি বাতাসে ক্ষতিকর সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা PM2.5-এর মাত্রা মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আমাদের ত্বকের স্বাভাবিক কোলাজেন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অকাল বার্ধক্য, অ্যালার্জি ও স্কিন র্যাশের রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
গাছ প্রাকৃতিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করে দূষিত কণা ও বিষাক্ত গ্যাস শোষণ করে।
পর্যাপ্ত সবুজ না থাকায় শরীরের ক্ষত নিরাময় প্রক্রিয়া যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে প্রদাহজনিত জটিলতা বেড়ে যায়।
পরিবেশের এই দ্রুত অবনতি শিশুদের চোখের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. নুসরাত লুবনা ইসলাম, যিনি দুই কন্যাসন্তানের মা, নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক উদ্বেগের কথা জানান:
গাছপালা এবং প্রাকৃতিক খোলা জায়গা শিশুদের চোখের জন্য প্রাকৃতিক দৃষ্টি-সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে।
এখন শিশুদের চোখের সামনে কেবল কংক্রিটের দেয়াল আর কৃত্রিম পর্দা।
দূরপাল্লার সবুজ দৃশ্য না থাকায় শিশুদের চোখের পেশি বিশ্রাম পায় না, যার ফলে 'মায়োপিয়া' বা ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যা গত কয়েক বছরে প্রায় ৪০% বেড়েছে।
এছাড়া বাতাসে ধুলোবালি ও ধোঁয়া বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের ড্রাই আই সিনড্রোম এবং মারাত্মক চোখের অ্যালার্জি হচ্ছে।
আমার নিজের দুই ছোট্ট মেয়ের চোখের ভবিষ্যৎ নিয়েও আমি ভীষণ চিন্তিত।
| পরিবেশগত সূচক | আদর্শ মান | বর্তমান বাস্তবতা (ঢাকা ও আশপাশ) |
|---|---|---|
| সবুজের আচ্ছাদন | ২৫% | ৮% এর নিচে |
| তাপমাত্রার বৃদ্ধি (হিট আইল্যান্ড) | স্বাভাবিক মাত্রা | ৩°C – ৫°C বৃদ্ধি |
| বায়ুর মান (AQI) | ৫০ এর নিচে (ভালো) | ১৫০ – ৩০০+ (অস্বাস্থ্যকর/ঝুঁকিপূর্ণ) |
| গাছ কমে যাওয়ার ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ছে। বাতাস ফিল্টার এবং ঘর ঠান্ডা রাখতে বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে গেছে প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ। এছাড়া পাখির কোলাহল ও স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হওয়ায় শিশুদের মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। | ||
| নগরীর এই পরিবেশগত বিপর্যয় ঠেকাতে এখনই প্রতিটি আবাসিক প্লটে ন্যূনতম খোলা জায়গা রাখা, ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করা এবং রাস্তার পাশে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কংক্রিটের আগ্রাসন রুখে না দাঁড়ালে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুস্থভাবে শ্বাস নেওয়ার অধিকারটুকুও থাকবে না। |













