নাবিলা কবির: প্রতিদিনের ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেন মানবজীবনের সাথে জড়িযে পড়েছে।
বিশেষ করে ফেসবুক আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তবে যোগাযোগের মাধ্যম ছাড়িয়ে এটি এখন অনেকের কাছে সংবাদ জানার প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া সংবাদ বা তথ্য আসলে কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
সম্প্রতি পরিচালিত এক সংক্ষিপ্ত জরিপ এবং বিভিন্ন পেশাজীবীদের মতামতে ফেসবুক সংবাদের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে মিশ্র ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মেনোগ্রাফ জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা ফেসবুকে পড়া যেকোনো সংবাদ পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না।
তবে প্রায়শই বিভ্রান্তিকর শিরোনাম এবং চমকপ্রদ থাম্বনেইলের কারণে যাচাই করার আগেই অনেকে তা শেয়ার করে ফেলেন।
চিকিৎসা, স্বাস্থ্য এবং সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ নানা ইস্যুতে এই প্রবণতা মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক সংবাদে বিভ্রান্তি
ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিকর তথ্যের শিকার হয় স্বাস্থ্য খাত। এ বিষয়ে চিকিৎসকদের উদ্বেগ স্পষ্ট।
ডা. ফারদিন আফরিন ঋভু বলেন, "ফেসবুকে যেকোনো ঘরোয়া টোটকা বা অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা খুব দ্রুত ভাইরাল হয়।
রোগীরা প্রায়ই ফেসবুকে দেখা তথ্যের ওপর ভরসা করে প্রচলিত চিকিৎসা বাদ দিয়ে জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসেন।
ফেসবুকের চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো পোস্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া অন্ধভাবে বিশ্বাস করা বিপজ্জনক।"
একই উদ্বেগের কথা জানান ডা. ফারিয়া ফারজান। তার মতে, "জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য ফেসবুক ভালো মাধ্যম হলেও এখানে ভুয়া তথ্যের বিস্তার বেশি ঘটে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, টিকা কিংবা জটিল রোগের ক্ষেত্রে ক্লিকবেইট খবরের ফাঁদে পড়ে সাধারণ মানুষ মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত নেন।"
ডা. মো. হাসান আল ফাহিম ফেসবুকের অ্যালগরিদম ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বলেন, "অ্যালগরিদম তথ্যের সত্যতা যাচাই করে না, বরং লাইক-শেয়ারের ওপর ভিত্তি করে পোস্ট সামনে নিয়ে আসে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে ফেসবুকের খবর বিশ্বাস করার আগে সবসময় মূল উৎস বা চিকিৎসকের মতামত যাচাই করা জরুরি।"
অন্যান্য পেশাজীবীদের মূল্যায়ন
ফেসবুকের সংবাদের সত্যতা নিয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রের পেশাজীবীদের মধ্যেও গভীর শঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তানভীর আহমেদ বলেন, "শিক্ষার্থীদের মধ্যেও কোনো তথ্য গভীর বিশ্লেষণ না করে ফেসবুকে যা দেখেছে তা বিশ্বাস করার প্রবণতা দেখা যায়।
ফেসবুক তথ্যের প্রবাহ বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু সত্য যাচাইয়ের অভ্যাস কমিয়ে দিয়েছে। একাডেমিক বা সামাজিক যেকোনো তথ্য ক্রস-চেক না করা পর্যন্ত তা সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।"

অন্যদিকে, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও ডেটা বিশ্লেষক মালিহা জামান বলেন, "সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিউ ও এনগেজমেন্ট বাড়ানোর জন্য অনেক সময় সংবাদকে নাটকীয় রূপ দেওয়া হয়।
সাধারণ মানুষের জানা উচিত, একটি খবর ভাইরাল মানেই তা সত্য নয়। প্ল্যাটফর্মগুলোর ফ্যাক্ট-চেকিং ব্যবস্থা এখনো শতভাগ কার্যকর নয়,
তাই ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।"
জরিপের মূল ফলাফল
সংবাদের প্রতি অনাস্থা: জরিপে অংশ নেওয়া ৬৫% মানুষ ফেসবুকে দেখা রাজনৈতিক ও সংবেদনশীল খবর নিয়ে সন্দিহান থাকেন।
যাচাইয়ের অভাব: মাত্র ২০% পাঠক কোনো খবর বিশ্বাস করার আগে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে তা যাচাই করেন।
গুজব ছড়ানোর হার: জরিপ অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ও জরুরি প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবরের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
ফেসবুক তথ্যের আদান-প্রদানকে অত্যন্ত দ্রুত ও সহজ করে দিলেও, সত্য ও প্রোপাগান্ডার মধ্যকার সীমারেখা অনেক সময় অস্পষ্ট করে তোলে।
যেকোনো খবর শেয়ার বা বিশ্বাস করার আগে মূলধারার গণমাধ্যম, নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট
এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত যাচাই করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।













