এক যুবকের মানবিক যাত্রার গল্প ছয় বছরে চকবাজার ব্লাড ডোনার'স ক্লাব (CBDC) এর ৮ হাজার ব্যাগ রক্তদান ও বহুমুখী সামাজিক উদ্যোগ
রক্তদাতা থেকে প্রতিষ্ঠাতা হয়ে উঠার গল্প : একজন সাধারণ রক্তদাতা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন।
কিন্তু অসহায় মানুষের রক্তের তীব্র সংকট আর আর্তনাদ তাকে শুধু রক্তদানেই সীমাবদ্ধ রাখতে দেয়নি।
রক্তদাতা থেকে হয়ে উঠেছেন স্বেচ্ছাসেবক, আর সেখান থেকে আজ তিনি একটি সফল মানবিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা।
অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক বুক স্বপ্ন নিয়ে ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মানবিক ও সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন "চকবাজার ব্লাড ডোনার'স ক্লাব" (CBDC)।
বলছিলাম এ এম রিয়াজ কামাল হিরণ-এর কথা। ২৬ জুন ২০২০ সালের বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালীন সংকটের সময়ে যখন চারিদিকে রক্তের জন্য হাহাকার, তখন আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি তিনি।
সিদ্ধান্ত নেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে মানবসেবা করার।
সেই লক্ষ্যেই আত্মপ্রকাশ ঘটে চকবাজার ব্লাড ডোনার'স ক্লাবের।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ছয় বছরে সংগঠনটি সাফল্যের সাথে প্রায় ৮ হাজার ব্যাগ রক্ত বিনামূল্যে মুমূর্ষু ও অসহায় রোগীদের জন্য সংগ্রহ ও সহযোগিতা করেছে।
চট্টগ্রামের বুকে রক্তের সংকট মোকাবিলায় এই সংগঠনটি এখন এক অন্যতম আস্থার নাম।
শুধু রক্তদানেই সীমাবদ্ধ নয় CBDC-এর মানবিক কার্যক্রম।
সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সংগঠনটি নিয়মিত নানা সামাজিক কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রতি বছর অসহায় পরিবারগুলোর মাঝে ঈদ সামগ্রী বিতরণ, শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ এবং এতিম ও অসহায় কোরআনের হাফেজদের সম্মানে ‘একবেলা আহার’ কর্মসূচি।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এ এম রিয়াজ কামাল হিরণ বলেন, "২০২০ সালে যখন অসহায় মানুষের রক্তের জন্য ছটফটানি দেখতাম, তখন নিজের ভেতর এক তীব্র তাড়না অনুভব করি।
সেই সংকট থেকেই এই সংগঠনের জন্ম। আজ যখন কোনো মুমূর্ষু রোগীর মুখে
বা তার পরিবারের চোখে স্বস্তির হাসি দেখি, তখন সব কষ্ট সার্থক মনে হয়। আমাদের এই পথচলা মানবতার কল্যাণে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে যাবে।"
তরুণদের এই মানবিক উদ্যোগ চট্টগ্রামের সামাজিক অঙ্গনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আগামীতেও তারা তাদের এই সেবামূলক কার্যক্রম আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে চান।
"রক্তযোদ্ধা হয়ে উঠার গল্প ও প্রথম রক্তদান"
সেদিন ছিলো ০৭/০১১/২০১৪ রোজ রবিবার। দুপুর আনুমানিক ১২ টার সময় আমার কাছে একজন ভদ্র লোক ফোন দিয়ে বললেন রিয়াজ ভাই বলছেন?
আমি বললাম জ্বী।
উনি বললেন আমি চট্টগ্রামের একটা ব্লাড গ্রুপ থেকে আপনার নাম্বার নিলাম। আপনার ব্লাড গ্রুপ কি ও পজিটিভ?
আমি বললাম হ্যাঁ আমার ব্লাড গ্রুপ ও পজিটিভ। উনি বললেন আমার ছেলের ব্লাড ক্যান্সার,
ও পজিটিভ রক্তের প্রয়োজন আপনি কি দিতে পারবেন?
আমি: কখন লাগবে ?
রোগীর বাবা: বিকাল ৬ টার মধ্যে। আমিঃ আমার তো কাজ শেষ করে বের হতে রাত ১০ টা হবে! এর আগে কোন ভাবেই সম্ভব নয়।
যদি রাত ১০ টার পর হয় তাহলে আমি দিতে পারবো।
রোগীর বাবা: না ভাই ৬ টার মধ্যেই লাগবে।
আমি: যদি কোনো ভাবে না পান আর রাত ১০ টার পর হয় তাহলে আমাকে কল দিয়েন আমি চকবাজারের আশেপাশে আছি।
এখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল খুব বেশি দূরে না।
রোগীর বাবা: আচ্ছা ভাই
এরপর রোগীর বাবার ফোন আসলো সন্ধ্যার পরে আনুমানিক ৭ টার দিকে।
ফোন দিয়ে বললেন ভাই ব্লাড তো পাই নাই আপনি কি দিবেন? সমস্যা নাই ।
রোগীর বাবা: আচ্ছা ঠিক আছে আপনি তাহলে ১০ টার সময় আসেন আমিও বাসা থেকে বের হবো !
আমি: আগেই বলেছি রাত ১০ টার পর হলে আমার কোনো সমস্যা নেই। আপনি কি হাসপাতালে নাই?
আমার তখন একটা কথা মনে পড়লো ব্লাডের দালালদের অভাব নাই
রোগীর বাবা: না ভাই ব্লাড না পাওয়ার কারণে বাসায় চলে এসেছি।
আপনি যদি এখন দেন তাহলে এই ব্লাড টা টেনে রাখবো কালকে push করাবে। সাথে সাথেই ফোন দিলাম ব্লাড গ্রুপের দেওয়া ফোন নম্বরে।
ফোন দিয়ে বললাম ভাই আপনাদের গ্রুপ থেকে ফোন দিয়েছিলো এক লোক। তার নাকি ব্লাড লাগবে।
কিন্তু তার রোগী হাসপাতালে নাই! আমি তো কোনোদিন এর আগে ব্লাড দেই নাই। যদি দালাল হয় তাহলে আমার প্রথম রক্তদান বৃথা !
পরে ঐ গ্রুপের আইডি ভাই বললেন রোগীর লোকের নাম্বার আমাকে দেন আমি কথা বলে দেখি! পরে উনি রোগীর লোকের সাথে কথা বললেন।
রোগীর বাবা ব্লাড গ্রুপের ভাইকে সব কিছুর বিস্তারিত তথ্য দিলেন।
হাসপাতালের ভেতরে গেলাম ব্লাড স্যাম্পল দিলাম। টেস্ট করে ব্লাড দিয়ে বাসায় আসতে রাত ১২:৪৫ বাজলো।
এতো রাতেই ব্লাড গ্রুপের ভাইকে ফোন দিয়ে বললাম ভাই ব্লাড দিয়ে আসলাম।
আমি তখনও জানতাম না যে উনার নামই আলাউদ্দিন! আর সেটা তারই ফোন নম্বর। আমি যে ব্লাড গ্রুপের আইডির সাথে যোগাযোগ করছিলাম। উনি আমার রক্তদানের ছবিটা নিলেন।
পরের দিন দেখি গ্রুপে আমার রক্তদানের ছবি পোষ্ট করেছেন।
আমিতো এটা জানতামও না যে ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে ব্লাড ম্যানেজ হয়! আমার ছবিতে অনেকগুলো লাইক দেখে মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম শুধু!
আমার ছবি, পোস্টে কখনো এতো লাইক পরে নাই! সত্যি বলতে ফেসবুকের অনেক কিছুই বুঝতাম না।
ক্যাপশন সহ পোস্টটাই আমাকে পরবর্তীতে রক্তদান নিয়ে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছিলো।
বলা বাহুল্য, রক্তদানের পর আমার ১০৪ ডিগ্রি জ্বর আসে! আমাকে অনেকেই বলতেছিলো ব্লাড দিলে জ্বর হয় দেখেছো?
আমি আমার কথায় অনড় ছিলাম যে ব্লাড দেওয়ার কারণে জ্বর আসছে এটা আমি মানি না।
বিশ্বাসও করি নাই। হয়তো সিজিনাল বা অন্য কোন কারণেই জ্বর এসেছিলো।
ফেসবুক গ্রুপ, পেজ অনেক কিছু জানতাম না। নিজেরও রক্তদানের আগ্রহ ছিলো কিন্তু সুযোগ পাচ্ছিলাম না।
বিভিন্ন app এ রেজিস্ট্রেশনও করেছিলাম! কোন সাড়া-ডাক পাইনি।
এখন আমারে যারা রক্তদিতে নিষেধ করেছিল অনেকজনই রক্তদানের জন্য আমার কাছে আগ্রহ প্রকাশ করে। রক্তদানের সময় হলেই আমাকে জানিয়ে দেয়, রোগি খুঁজে দিতে বলে।
আমার আশেপাশে কারো রক্ত লাগলেও একটাই নাম! রক্তযোদ্ধা ভাই।।
পৃথিবীর সকল রক্তযোদ্ধাদের প্রতি লাল ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
আরো পড়ুন....
বাংলাদেশ গ্রীন আর্মি ব্লাড ব্যাংকের স্বেচ্ছাসেবীদের মাঝে পোশাক বিতরণ













