পাকিস্তান কি আরেকটি ১৯৭১-এর মুখোমুখি?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তাকালে একটি সত্য বারবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কোনো রাষ্ট্র কেবল সামরিক শক্তি কিংবা অস্ত্রের মুখে তার ভৌগোলিক সীমান্ত অনির্দিষ্টকাল টিকিয়ে রাখতে পারে না।
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার জনগণের রাজনৈতিক সম্মতি, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার ওপর।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বর্তমানে এই কঠিন ও ঐতিহাসিক পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে পাকিস্তান।
সম্প্রতি পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তানে সশস্ত্র হামলা, সামরিক অভিযান, সামাজিক ক্ষোভ এবং তরুণ প্রজন্মের অধিকার আদায়ের আন্দোলন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে।
এই অস্থিরতা নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সংঘাতের মাত্রাকে এক নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, বেলুচিস্তানের এই ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা ও বিদ্রোহ
কি পাকিস্তানকে আরেকটি বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি কি আবারও কোনো সতর্কবার্তা হয়ে ফিরে আসছে? আসুন, বেলুচিস্তানের
এই বহুমাত্রিক সংকটের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা যাক।
বেলুচিস্তান ও ১৯৭১: ঐতিহাসিক স্মৃতি ও গভীর বৈপরীত্য
যখনই বেলুচিস্তানে সেনা অভিযান, নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি এবং স্থানীয় গণ-অসন্তোষের খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ার শিরোনাম হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই ১৯৭১ সালের পাকিস্তানের স্মৃতি ইতিহাসের পাতা থেকে ভেসে ওঠে।
এই মানসিক সংযোগের পেছনে একটি ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে।
১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) বাঙালি নিধন ও সামরিক দমনপীড়নের কুখ্যাত নির্দেশক ছিলেন জেনারেল সংগ্রাট টিক্কা খান, যিনি ‘বুচার অব বেঙ্গল’ নামে পরিচিতি পান।
পূর্ব পাকিস্তানে আসার ঠিক আগেই টিক্কা খান বেলুচিস্তানের সামরিক গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন
এবং সেখানেও কঠোর সামরিক অভিযান চালিয়েছিলেন।
ফলে দুই অঞ্চলের প্রতি পাকিস্তান সরকারের মনোভাবের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়।
তবে ইতিহাসের এই ভয়াবহ স্মৃতির পুনরাবৃত্তি সত্ত্বেও, ১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমান বেলুচিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে কিছু মৌলিক ও গঠনমূলক বৈপরীত্য রয়েছে:
(ক) রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও গণপরায়ণতা
১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত একচ্ছত্র গণতান্ত্রিক বৈধতা ছিল।
একক নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাঙালি জনগণ ঐক্যবদ্ধ ছিল।
অন্যদিকে, বেলুচিস্তানের বর্তমান সশস্ত্র আন্দোলনের কোনো একক রাজনৈতিক নেতৃত্ব নেই।
বেলুচ সমাজ এখনো বিভিন্ন গোত্র, গোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত।
প্রদেশটির অনেক রাজনৈতিক দল ও নেতা পাকিস্তানের সংবিধানের আওতাতেই অধিকতর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে চায়; সবাই সরাসরি স্বাধীনতার পক্ষে নয়।
(খ) আন্তর্জাতিক সমর্থন ও ভূরাজনৈতিক মিত্রতা
বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে তৎকালীন বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও মিত্র শক্তির প্রত্যক্ষ সমর্থন কাজ করেছিল।
ভারতের সামরিক সহযোগিতা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের কূটনৈতিক সমর্থন বাঙালিদের সংগ্রাহক শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র দলগুলোকে (যেমন: বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ) যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্ব সম্প্রদায় সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে।
প্রতিবেশী দেশ ইরান বা আফগানিস্তান, কেউই নিজেদের সীমান্ত নিরাপত্তার স্বার্থে পাকিস্তানের ভূখণ্ড বিভক্ত হোক তা চায় না।
(গ) প্রশাসনিক ও ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে একটি বিশাল ভূখণ্ড এবং পরবর্তীতে অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়েছিল।
বেলুচিস্তানে বিএলএ বা অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠী বিচ্ছিন্নভাবে বড় হামলা পরিচালনা বা সাময়িকভাবে সড়ক অবরোধ করার সক্ষমতা দেখালেও, কোয়েটাসহ প্রধান প্রধান শহর,
গুরুত্বপূর্ণ জেলা এবং মূল প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলো এখনো পাকিস্তান সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য: সম্পদের প্রাচুর্য বনাম জনমানুষের বঞ্চনা

বেলুচিস্তান সংকটের মূল শিকড় কোনো আকস্মিক নিরাপত্তার সংকট নয়, বরং এটি কয়েক দশক ধরে চলা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাস।
পাকিস্তান ভৌগোলিকভাবে যে আয়তন ধারণ করে, তার প্রায় ৪৪ শতাংশ জুড়েই অবস্থিত এই বেলুচিস্তান।
কিন্তু বৈপরিত্য হলো, আয়তনে এত বড় এবং প্রাকৃতিক সম্পদে এত সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও এটি পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র ও অনুন্নত প্রদেশ।
প্রাকৃতিক সম্পদের মূল ভাণ্ডার: বেলুচিস্তান হলো প্রাকৃতিক গ্যাসের এক বিশাল উৎস।
সুই গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত গ্যাস গত কয়েক দশক ধরে করাচি, লাহোর, ফয়সালাবাদ ও ইসলামাবাদের শিল্পকারখানা এবং গৃহস্থালি চালিয়েছে।
এ ছাড়া এখানে তামা, স্বর্ণ, কয়লা এবং অন্যান্য কৌশলগত খনিজের অফুরন্ত মজুত রয়েছে (যেমন রিগো দিক স্বর্ণ ও তামা প্রকল্প)।
উন্নয়নের বৈষম্য: আক্ষেপের বিষয় হলো, যে গ্যাস পাকিস্তানের শিল্প খাতকে বাঁচিয়ে রেখেছে, বেলুচিস্তানের বহু জেলায় আজ পর্যন্ত সেই গ্যাসের পাইপলাইন পৌঁছেনি।
প্রদেশটির অধিকাংশ মানুষ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, করাচি ও পাঞ্জাবের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বেলুচিস্তানের সম্পদ শোষণ করা হলেও, বিনিময়ে এই অঞ্চলের কপালে জুটেছে শুধু দারিদ্র্য ও বেকারত্ব।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষোভের বিস্তার: অর্থনৈতিক বঞ্চনার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ।
গুম (Enforced Disappearances), বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং সীমান্ত এলাকায় সর্বব্যাপী সামরিক তদারকি স্থানীয় তরুণদের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতাবোধের জন্ম দিয়েছে।
যখন নাগরিকরা অনুভব করে যে রাষ্ট্র কেবল ভূখণ্ডের সম্পদের প্রতি আগ্রহী, মানুষের জীবনমান বা সম্মান রক্ষায় নয়, তখন বিচ্ছিন্নতার বীজ আরও গভীরে শেকড় সারে।
ভূরাজনীতি ও চীনের অনুঘটক ভূমিকা (CPEC & Gwadar Port)

বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি আজ আর কেবল ইসলামাবাদের অভ্যন্তরীণ ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিশ্ব শক্তির বড় এক ভূরাজনৈতিক খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো চীন।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের স্বপ্নের প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর মূল প্রাণকেন্দ্র হলো চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC)। এই মেগা-প্রকল্পটির দক্ষিণতম প্রান্ত হলো বেলুচিস্তানের কৌশলগত সমুদ্রবন্দর গওয়াদর (Gwadar)।
- শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ: চীন CPEC প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬ হাজার কোটি (৬০ বিলিয়ন) ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করছে, যার বড় একটি অংশ বেলুচিস্তানের অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
- বিদ্রোহীদের আক্রমণ ও বেইজিংয়ের উদ্বেগ: স্থানীয় বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো চীনের এই বিনিয়োগকে স্থানচ্যুতকরণ এবং "নব্য-উপনিবেশিক আগ্রাসন" হিসেবে দেখে।
- ফলে তারা প্রায়শই চীনা প্রকৌশলী, নাগরিক এবং কৌশলগত প্রকল্পের ওপর আক্রমণ চালিয়ে আসছে।
- নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ: বেইজিং কোনোভাবেই বেলুচিস্তানকে একটি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীল অঞ্চল হিসেবে দেখতে চায় না।
ফলে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীকে অভ্যন্তরীণ সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বেইজিংয়ের দিক থেকেও বিশাল মনস্তাত্ত্বিক
ও অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে হচ্ছে।
এর মানে হলো, বেলুচিস্তান ইস্যুতে পাকিস্তানের পেছনে সামরিক শক্তির পাশাপাশি চীনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক শক্তিও ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
অপারেশন শাবান’ ও নতুন প্রজন্মের রূপান্তরিত বেলুচ আন্দোলন
সম্প্রতি মাসতুং এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর বহরে সশস্ত্র হামলা এবং জিয়ারতের ড্যাম এলাকায় পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমণের পর
পাকিস্তান সেনাবাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিমানবাহিনীকে সাথে নিয়ে শুরু করে সমন্বিত সেনা অভিযান ‘অপারেশন শাবান’।
ইসলামাবাদ দাবি করেছে, এই অভিযানের মাধ্যমে অনেক বিএলএ বিদ্রোহীকে নির্মূল করা হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, প্রতিটি সামরিক অভিযানের আড়ালে সাধারণ জনগণের হয়রানি ও গুমের ঘটনা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সামরিক বলপ্রয়োগের বাইরেও বেলুচ আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরটি ঘটেছে এর অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যাগত কাঠামোর মধ্যে:
পাহাড় থেকে রাজপথে আন্দোলনের রূপান্তর: একসময় বেলুচ আন্দোলন বলতেই বোঝা যেত দুর্গম পাহাড়ে কয়েকজন সশস্ত্র উপজাতীয় গেরিলা যোদ্ধার আক্রমণ।
কিন্তু আজ এই আন্দোলনের ধরন অনেকটাই বদলে গেছে। আজ শিক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শহুরে মধ্যবিত্ত, শিক্ষক এবং বিশেষ করে নারীরা এই ক্ষোভের সামনের সারিতে চলে এসেছেন।
এই নতুন সামাজিক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছেন ডক্টর মাহরাং বেলুচ এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটি (BYC)।
রাজপথে হাজার হাজার নারীকে সাথে নিয়ে তাঁরা নিখোঁজ স্বজনদের ফিরিয়ে দেওয়া
এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ অথচ অত্যন্ত কঠোর প্রতিবাদ গড়ে তুলেছেন।
এই সামাজিক প্রতিরোধ বেলুচদের ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মঞ্চে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে, যা সামরিক শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা ইসলামাবাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
চারমুখী সংকটে জর্জরিত পাকিস্তান
পাকিস্তান আজ কেবল বেলুচিস্তানের সংঘাত নিয়ে চিন্তিত নয়। দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থান অত্যন্ত ভঙ্গুর, কারণ রাষ্ট্রটিকে একই সঙ্গে চারটি প্রধান ফ্রন্টে লড়াই করতে হচ্ছে:
| সংকটের ক্ষেত্র | বর্তমান বাস্তবতার ধরণ |
| ১. অর্থনৈতিক মন্দা | মূল্যস্ফীতি, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (IMF) কঠিন শর্তাবলী। |
| ২. রাজনৈতিক বিভাজন | সরকার, বিরোধী দল এবং বিচারব্যবস্থার মধ্যে চরম অস্থিতিশীলতা ও মেরুকরণ। |
| ৩. উত্তর-পশ্চিমে সন্ত্রাস | খাইবার পাখতুনখোয়ায় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP)-এর প্রাণঘাতী পুনঃউত্থান। |
| ৪. দক্ষিণ-পশ্চিমে সংঘাত | বেলুচিস্তানে তীব্রতর হতে থাকা সশস্ত্র ও সামাজিক অসন্তোষ। |
এই চারমুখী সংকট পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সক্ষমতাকে দিন দিন ক্ষয় করে ফেলছে।
সামরিক শক্তি দিয়ে বিচ্ছিন্ন হামলা ঠেকানো গেলেও, অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখা এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সামরিক আদেশের দ্বারা সম্ভব নয়।
উপসংহার
পরিশেষে, বর্তমান বস্তুনিষ্ঠ উপাত্ত ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, পাকিস্তান এখনই ১৯৭১ সালের মতো ভেঙে টুকরো হয়ে যাচ্ছে এমন উপসংহারে পৌঁছানো তথ্যভিত্তিক নয়।
বেলুচ আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাব
এবং পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর বিশাল সক্ষমতার কারণে সামরিক শক্তিতে ভূখণ্ড বিচ্ছিন্ন করা বিদ্রোহীদের জন্য প্রায় অসম্ভব।
তবে এটিও একইভাবে সত্য যে, কেবল গানপাউডার আর সেনা অভিযান চালিয়ে বেলুচিস্তানের সংকট সমাধান করা যাবে না।
ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, বন্দুকের নল দিয়ে হয়তো ক্ষণিকের জন্য ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়, কিন্তু মানুষের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা ও অধিকারবোধকে এভাবে চিরতরে দাবিয়ে রাখা যায় না।
ইসলামাবাদ যদি বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল একটি "আইনশৃঙ্খলার সমস্যা" হিসেবে না দেখে,
বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করা, ন্যায়সংগত প্রাকৃতিক সম্পদের ভাগ বণ্টন করা, সামরিক শাসন সংকুচিত করা এবং রাজনৈতিক সংলাপে বসার প্রজ্ঞা দেখায়, তবেই এই ক্ষোভ প্রশমিত হতে পারে।
বেলুচিস্তানের আগুন শেষ পর্যন্ত নিভে যাবে নাকি পাকিস্তানের মূল রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই ছাই করে দেবে,
তার চূড়ান্ত উত্তর লুকিয়ে আছে যুদ্ধক্ষেত্রের সামরিক আদেশে নয়, রাষ্ট্র পরিচালকদের প্রজ্ঞার ওপর।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (Frequently Asked Questions - FAQ)
বেলুচিস্তান কি সত্যি পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে?
উত্তর: না, বর্তমান তথ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বেলুচিস্তান এখনই পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাময়িক হামলা চালানোর সক্ষমতা থাকলেও কোয়েটাসহ প্রধান শহর, মূল সড়ক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর পাকিস্তান সরকারের শক্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
অপারেশন শাবান' কি এবং কেন এটি চালানো হচ্ছে?
উত্তর: বেলুচিস্তানের জিয়ারত, মাসতুং এবং কোয়েটাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর (বিশেষ করে বিএলএ) সমন্বিত আক্রমণের পর,
পাকিস্তান সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা মিলে যে যৌথ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করছে, তাকেই 'অপারেশন শাবান' বলা হচ্ছে।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে বেলুচিস্তানের মূল পার্থক্যগুলো কী কী?
উত্তর: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব (বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ), স্পষ্ট ভৌগোলিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, সর্বাত্মক গণসমর্থন এবং ভারত ও ভারতের মিত্রদের কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন ছিল।
বেলুচিস্তানে বর্তমান আন্দোলনটি বহুধা বিভক্ত, এতে একক কোনো নেতৃত্ব নেই এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে এর সশস্ত্র দলগুলো সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত।
বেলুচিস্তানের অস্থিতিশীলতা নিয়ে চীনের এত গভীর উদ্বেগ কেন?
উত্তর: চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC)-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ গওয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দরটি বেলুচিস্তানে অবস্থিত। চীন সেখানে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।
বেলুচিস্তানে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা বা চীনা নাগরিকদের ওপর হামলা সরাসরি চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে আঘাত করে।
বিএলএ (BLA) এবং বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটির (BYC) মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: বিএলএ (Baloch Liberation Army) হলো একটি নিষিদ্ধ সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন, যারা সশস্ত্র সংঘাত ও হামলার মাধ্যমে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা দাবি করে।
অন্যদিকে, বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটি (BYC) হলো একটি অহিংস ও শান্তিপূর্ণ সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন (যার অন্যতম নেত্রী মাহরাং বেলুচ),
যারা মানবাধিকার, গুম রোধ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবিতে আইনি ও রাজপথের আন্দোলন পরিচালনা করে।
-প্রেসপয়েন্টবিডি/আন্তর্জাতিক













