তুরাগে তাহসিফের মরদেহ, রহস্য কাটেনি

Ahmed Siam

প্রকাশ :অক্টোবর ২৯, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক:

নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর তুরাগ নদে পাওয়া গেছে বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মরদেহ। মৃত্যুর আগে তাঁর গতিবিধি, শেষ যোগাযোগ এবং মরদেহ উদ্ধারের স্থান নিয়ে পরিবারের বক্তব্যে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে মৃত্যুর কারণ এখনো জানা যায়নি।

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল জানিয়েছেন, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামে ছেলের এক বন্ধু ও জুনিয়র বাসার নিচে এসে তাঁকে ডাকেন। মাকে জানিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বের হন তাহসিফ। এরপর আর বাসায় ফেরেননি।

ঘটনার দিন তাহসিফ মায়ের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন এবং মা-বাবার জন্য কেনাকাটা করেছিলেন। রাতে পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে ‘আম্মু, আমি আসছি’ লিখে বার্তা পাঠালেও এরপর তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

বুধবার দুপুরে ছেলের সন্ধানে তুরাগ থানায় যান হেলাল। তিনি জানান, থানা থেকে তাঁকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু একই দিন বিকেল সোয়া ৫টার দিকে উত্তরখান থানার ওসি ফোন করে নদীতে মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

হেলালের দাবি, রাজাবাড়ি ঘাটের যে এলাকায় তাহসিফের মরদেহ পাওয়া গেছে, সেখানে তাঁর ছেলে আগে কখনো যাননি। ফলে ওই এলাকায় কীভাবে পৌঁছালেন, নিখোঁজ হওয়ার পর কার সঙ্গে ছিলেন এবং কী পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিবার।

এর মধ্যে তাহসিফের বিমান বাহিনীর চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে তাঁর চাকরি ছাড়ার সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।

তাহসিফের বাবা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে পরিবারকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে শৃঙ্খলাজনিত কারণে চাকরি থেকে অব্যাহতির কথা বলা হয়েছিল। তাহসিফ কোনো হুমকির কথা না জানালেও একটি বিষয় নিয়ে আশঙ্কায় ছিলেন বলে বাবাকে জানিয়েছিলেন।

মৃত্যুর প্রায় তিন মাস আগে, গত ২১ জুলাই ‘স্পিক উইথ রশিদ’ চ্যানেলে প্রকাশিত একটি পডকাস্টে এসব অভিযোগ নিয়ে কথা বলেছিলেন তাহসিফ। সেখানে তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনকে অপপ্রচার বলে দাবি করেন তিনি।

পডকাস্টে তাহসিফ বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আনা হলেও ভিডিওটি তিনি ধারণ করেছিলেন, এমন দাবি করা হয়নি। অভিযোগের প্রমাণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। চাকরি ছাড়ার সঙ্গে ওই ঘটনার সম্পর্ক থাকতে পারে বলে মন্তব্য করলেও সব তথ্য প্রকাশে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা জানান।

এদিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত কে এস এম ইনতিসার ইনজামাম নিজেকে তাহসিফের বন্ধু পরিচয় দিয়ে ফেসবুকে মৃত্যুর ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও প্রকাশের ঘটনার সঙ্গে মৃত্যুর সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তবে তাঁর এসব বক্তব্য ব্যক্তিগত ধারণা; এ বিষয়ে কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তাহসিফ বিমান বাহিনী ছাড়ার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও নেত্র নিউজে কাজ করেন। সর্বশেষ তিনি ভার্গো টোব্যাকোতে কর্মরত ছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা।

নৌপুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ৯৯৯-এর মাধ্যমে উত্তরখানের রাজাবাড়ি ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে মরদেহ ভাসার খবর পাওয়া যায়। পরে টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করেন।

তখন তাহসিফের পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। তাঁর হাতে একটি ঘড়ি এবং পকেটে আইফোন পাওয়া যায়। ফোনের সূত্র ধরে পরিচয় শনাক্তের পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে কোনো অপরাধের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। ময়নাতদন্ত ও তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ এবং নিখোঁজ থাকার সময়ের ঘটনাপ্রবাহ পরিষ্কার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।