নিজস্ব প্রতিবেদক:
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামোর অর্থ জোগাতে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ছে সরকারের। অক্টোবরের বেতন ও তিন মাসের বকেয়া পরিশোধে পাঁচ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম ডাকা হয়েছে।
আগামী ১ নভেম্বর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও বকেয়া পরিশোধের কথা রয়েছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সাধারণত সরকার ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি ঋণ সংগ্রহ করে। তবে রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলে বিশেষ ব্যবস্থায় ১৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ইস্যু করা হয়। এবার নতুন বেতনকাঠামোর বাড়তি ব্যয় মেটাতে সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন বেতন অনুযায়ী অর্থ পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় এ নিলামের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, অক্টোবরের প্রথম ২৭ দিনে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকার ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। প্রস্তাবিত পাঁচ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হলে মাস শেষে মোট ঋণ উত্তোলন হবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বর্তমান সরকারের মেয়াদে এক মাসে এত বেশি ঋণ এর আগে নেওয়া হয়নি।
চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে ব্যাংক খাত থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ সংগ্রহ করা হয়। আগস্টে এর পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে এই ঋণের বড় অংশ পুরোনো বিল ও বন্ডের দায় পরিশোধ এবং পুনঃঅর্থায়নে ব্যবহার করা হয়েছে।
এ কারণে মোট ঋণ উত্তোলনের সঙ্গে প্রকৃত ঋণ বৃদ্ধির পার্থক্য রয়েছে। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের নিট ব্যাংক ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা এসেছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। অবশিষ্ট অর্থ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ঋণের চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ট্রেজারি বিলের সুদহারেও। ৯১ দিন মেয়াদি বিলের ইল্ড ৫ অক্টোবরের ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ থেকে ২৬ অক্টোবর ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে ওঠে। যদিও আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল চার লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় সরকারকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারের অর্থের চাহিদা পূরণ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের চাপ কমাতে চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার শরিয়াহভিত্তিক সুকুক ইস্যুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের বাজেটের আকার নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এতে ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আগের অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য চলতি অর্থবছরে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ প্রথম দুই মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। পরবর্তী মাসগুলোতেও রাজস্ব আদায় লক্ষ্যের নিচে থাকায় সরকারের ঋণের প্রয়োজন বাড়ছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দিতে বিশেষ ট্রেজারি বিল ইস্যুর উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। তাঁর মতে, আয় না বাড়িয়ে ব্যয় বাড়াতে থাকলে ঋণের বোঝা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এর নেতিবাচক প্রভাব বেসরকারি খাতেও পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও রাজস্ব ঘাটতিকে ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সরকারকে পুরোনো ঋণের দায় পরিশোধ করতেও নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে।
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশে বর্তমানে বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা খাত মিলিয়ে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় নয় লাখ ২৫ হাজার। চলতি অর্থবছরে বেতন, ভাতা ও পেনশন বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা।
প্রাক্কলন অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামো সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। তবে এ ব্যয় বহন করতে হলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে।
Google News-এ Press Point BD-এর খবর দেখুন আমাদের সর্বশেষ সংবাদ ও প্রতিবেদন Google News-এ পড়ুন।
সূত্র: বণিক বার্তা














