নারীরা গণপরিবহনে কোন সমস্যার মুখোমুখি হন

shohrab russel

প্রকাশ :আগস্ট ২৫, ২০২৬

নারীরা গণপরিবহনে কোন সমস্যার মুখোমুখি হন

নাবিলা কবির

নিজস্ব জরিপ ও অভিজ্ঞতার চালচিত্র
প্রতিদিনের কর্মব্যস্ত জীবনে গণপরিবহনই অধিকাংশ মানুষের প্রধান ভরসা। তবে বাংলাদেশের নারীদের জন্য এই গণপরিবহনে যাতায়াত যেন এক নিত্যদিনের যুদ্ধক্ষেত্র। অফিসগামী নারী, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রয়োজনে বের হওয়া নারীরা প্রতিনিয়ত নানা শারীরিক, মানসিক ও অবকাঠামোগত বাধার মুখোমুখি হন। সাম্প্রতিক এক নিজস্ব জরিপ ও সরাসরি মতবিনিময়ে উঠে এসেছে নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারের তিক্ত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা।
জরিপের মূল ফলাফল ও প্রধান সংকটসমূহ
জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের অভিজ্ঞতাকে বিশ্লেষণ করলে প্রধানত চারটি সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
যৌন হয়রানি ও অস্বস্তিকর স্পর্শ: জরিপে অংশ নেওয়া ৮৫ শতাংশেরও বেশি নারী জানিয়েছেন, বাসে ওঠা-নামার সময় কিংবা ভিড়ের সুযোগে সহযাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের দ্বারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত স্পর্শ বা আপত্তিকর আচরণের শিকার হয়েছেন।
সংরক্ষিত আসনের অপ্রতুলতা ও দখল: অধিকাংশ বাসে নারীদের জন্য মাত্র ৯টি আসন বরাদ্দ থাকে। অনেক সময় পুরুষ যাত্রীরা সেসব আসনে বসে থাকেন এবং নারীরা অনুরোধ করলেও আসন ছাড়তে চান না।
শারীরিক স্বাস্থ্য ও দীর্ঘ যানজটের ধকল: গর্ভবতী নারী, অসুস্থ বা মোশন সিকনেস ও ভার্টিগোতে আক্রান্তদের জন্য অস্বাস্থ্যকর ও ঝাঁকুনিপূর্ণ পরিবেশ পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তোলে।
নিরাপত্তাহীনতা ও পরিবহন শ্রমিকদের অসদাচরণ: রাতের বেলা গণপরিবহনে ওঠার ক্ষেত্রে চরম নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে। পাশাপাশি চালক ও সহকারীদের অপেশাদার এবং আক্রমণাত্মক আচরণ অত্যন্ত সাধারণ চিত্র।
ভুক্তভোগীদের সরাসরি অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য
১. ভিড়ের সুযোগে নীরব হেনস্তা
মহাখালীর বাসিন্দা নাদিয়া জামান (৩২+) প্রতিদিন বাসে করে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
"অফিস টাইমে বাসে ওঠাটাই যেন যুদ্ধ। দাঁড়িয়ে থাকার সময় বা ওঠার মুহূর্তে ইচ্ছাকৃতভাবে গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করে অনেকে। প্রতিবাদ করলে উল্টো শুনতে হয়—'এত সমস্যা হলে সিএনজি বা প্রাইভেট কারে যান না কেন?' এই মানসিকতা আমাদের চলার পথকে প্রতিদিন সংকুচিত করছে।"
২. নিরাপত্তার ঘাটতি ও অনির্দিষ্ট অপেক্ষা
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা নীহারিকা জাহান (৩৩+) নিয়মিত যাতায়াতের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বাহন ও নিরাপত্তার অভাবকে দায়ী করেন:
"সন্ধ্যা নামলেই বাস পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সংরক্ষিত আসনগুলোতে পুরুষরা বসে থাকে, চাইলেও হেল্পার বা সহযাত্রীরা পাশে দাঁড়ায় না। রাতে একা বাসে ওঠা একেবারেই নিরাপদ মনে হয় না। সিসিটিভি ক্যামেরা বা নারীবান্ধব হেল্পলাইন সেবা ছাড়া এই ভয় কাটানো সম্ভব নয়।"
৩. শারীরিক অসুস্থতা ও মোশন সিকনেসের যন্ত্রণা
বগুড়ার বাসিন্দা আরেফিন জান্নাত (৩৩+) দীর্ঘ দূরত্বের ও স্থানীয় যাতায়াতের ক্ষেত্রে চরম শারীরিক ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। তিনি তীব্র মোশন সিকনেস এবং ভার্টিগো সমস্যায় ভোগেন। আরেফিন বলেন:
"আমার মোশন সিকনেস ও ভার্টিগোর তীব্র সমস্যা রয়েছে। বাসের ঝাঁকুনি, পেট্রোলের বিষাক্ত ধোঁয়া আর অতিরিক্ত গরমের ভেতরে যখন দমবন্ধ পরিবেশ তৈরি হয়, তখন মাথা ঘুরে বমি শুরু হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত বাতাস আসার জানালা খোলা থাকে না বা পেছনের খারাপ সিটে বসতে বাধ্য হতে হয়। অসুস্থ মানুষের প্রতি কোনো মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এই গণপরিবহনে মেলে না।"
সংকট নিরসনে করণীয়
গণপরিবহনকে নারীবান্ধব করতে কাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি:
'উইমেন-অনলি' বাস ও ডেডিকেটেড সার্ভিস বৃদ্ধি: ব্যস্ততম রুটগুলোতে নারীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিসের সংখ্যা বহুগুণ বাড়ানো।
কঠোর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: প্রতিটি বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, জরুরি হেল্পলাইন নম্বর দৃশ্যমান রাখা এবং অপরাধীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা।
ফিটনেসবিহীন বাহন প্রত্যাহার: ঝাঁকুনি ও অতিরিক্ত দূষণ রোধে ফিটনেসবিহীন যান চলাচল পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা, যাতে অসুস্থ ও সাধারণ যাত্রীরা স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারেন।
সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবহন শ্রমিক ও পুরুষ সহযাত্রীদের সংবেদনশীল করতে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা।
একটি সভ্য ও গতিশীল সমাজের অন্যতম শর্ত হলো সবার জন্য নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা। নারীদের গৃহকোণ থেকে বের হয়ে অর্থনীতিতে অবদান রাখতে হলে গণপরিবহনে নিরাপত্তা ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

আরো পডুন...

ঢাকায় আয় বাড়ছে না, খরচ থামছে না