Widal পরীক্ষার ভুল ব্যবহার এবং এর নেতিবাচক প্রভাব

প্রেসপয়েন্ট বিডি

প্রকাশ :আগস্ট ১৭, ২০২৬

Widal পরীক্ষা

ডা. নাবিলা কবির: Widal পরীক্ষার ভুল ব্যবহার।

Widal পরীক্ষা (Widal Test) দীর্ঘদিন ধরে এশিয়া ও আফ্রিকার টাইফয়েডপ্রবণ অঞ্চলে এন্টারিক ফিভার বা টাইফয়েড শনাক্তকরণের জন্য বহুল ব্যবহৃত একটি প্রচলিত পদ্ধতি।

তবে এই পরীক্ষার মূল এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর ফলাফল প্রায়শই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয় এবং একে অনেক সময় রোগের একমাত্র ও চূড়ান্ত নির্ণায়ক (Definitive Diagnostic Tool) হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ত্রুটিপূর্ণ একটি ধারণা।

টাইফয়েড রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে Widal পরীক্ষার প্রধান ত্রুটিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

ক্রস-রিয়াক্টিভিটি বা অন্যান্য রোগের প্রভাব: Widal পরীক্ষা মূলত রক্তের সিরামে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পরীক্ষা করে।

কিন্তু সমস্যা হলো, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, যক্ষ্মা বা অন্য কোনো ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের কারণেও রোগীর শরীরে অনুরূপ অ্যান্টিবডি তৈরি হতে পারে।

এর ফলে সুস্থ বা ভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকেও টাইফয়েড পজিটিভ হিসেবে চিহ্নিত করার আশঙ্কা থাকে।

এন্ডেমিক অঞ্চলে বেসলাইন অ্যান্টিবডি: বাংলাদেশসহ যেসব অঞ্চলে টাইফয়েড একটি নিত্যদিনের ব্যাপার (Endemic zone),

সেখানকার সুস্থ মানুষের রক্তেও স্বাভাবিকভাবেই নির্দিষ্ট মাত্রার অ্যান্টিবডি উপস্থিত থাকে।

ফলে সাধারণ টাইটারের মাত্রা দেখেই একে রোগ বলে ধরে নিলে তা ভুল প্রমাণিত হয়।

অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার: ভুল রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই বা শুধুমাত্র Widal পজিটিভ রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে যত্রতত্র শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

এর ফলে ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স (Antibacterial Resistance) তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে রোগীর জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনতে পারে।

রোগ নির্ণয়ে দীর্ঘসূত্রিতা: টাইফয়েডের প্রাথমিক পর্যায়ে (প্রথম সপ্তাহে) রোগীর রক্তে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না।

এই সময়ে Widal পরীক্ষা করা হলে ফলাফল নেতিবাচক (False-negative) আসতে পারে, যা রোগীকে ভুল নিরাপত্তাবোধে রাখতে পারে এবং সঠিক চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হতে পারে।

২. Widal পরীক্ষা: নির্দেশক (Indication) এবং এর চূড়ান্ত বা অচূড়ান্ত (Definitive or Non-definitive) প্রকৃতি

Widal পরীক্ষা চিকিৎসা ক্ষেত্রে ঠিক কখন ব্যবহার করা উচিত এবং এর নির্ভরযোগ্যতা কতখানি, তা নিচে স্পষ্ট করা হলো:

ক. নির্দেশক বা ইনডিকেশন (Indication)

লক্ষণভিত্তিক স্ক্রিনিং: যখন কোনো রোগীর দীর্ঘমেয়াদী জ্বর (সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনের বেশি স্থায়ী), মাথাব্যথা, শরীরে দুর্বলতা, এবং পেটে অস্বস্তির মতো উপসর্গ দেখা দেয়

এবং টাইফয়েডের সন্দেহ করা হয়, তখন এই পরীক্ষাটি প্রাথমিক বা সহায়ক স্ক্রিনিং টুল হিসেবে নির্দেশ করা হয়।

রিসোর্স-স্বল্প এলাকা: যেসব গ্রামীণ বা প্রান্তিক এলাকায় ব্যয়বহুল কালচার টেস্ট বা আধুনিক পিএসিআর (PCR) পরীক্ষার সুযোগ নেই,

সেখানে চিকিৎসকেরা অনেক সময় রোগের গতিপ্রকৃতি অনুমান করতে এই পরীক্ষার সাহায্য নেন।

কনভ্যালসেন্ট ফেজ (Convalescent Phase): রোগের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে যখন রক্তে অ্যান্টিবডি বা টাইটারের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, তখন এক জোড়া টেস্টের (Acute and Convalescent Sera) মাধ্যমে অ্যান্টিবডির মাত্রা বাড়ছে কি না তা তুলনা করার জন্য এটি নির্দেশিত হয়।

খ. এটি কি চূড়ান্ত না অচূড়ান্ত? (Definitive or Non-definitive)

স্পষ্টতই অচূড়ান্ত (Non-definitive): Widal পরীক্ষা কোনোভাবেই একটি চূড়ান্ত বা নিশ্চিত রোগ নির্ণায়ক পরীক্ষা নয়।

যুক্তিসঙ্গত কারণ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী,

শুধুমাত্র একটি একক Widal টেস্টের পজিটিভ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে টাইফয়েড নিশ্চিত করা যায় না।

এটি কেবল একটি 'প্রিজাম্পটিভ' বা অনুমানমূলক পরীক্ষা।

চূড়ান্ত নির্ণয়ের বিকল্প: টাইফয়েড জ্বর নিশ্চিত করার জন্য গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড বা চূড়ান্ত পদ্ধতি হলো কালচার টেস্ট যেমন ব্লাড কালচার (Blood Culture), বোন ম্যারো কালচার (Bone Marrow Culture),

অথবা স্টুল কালচার (Stool Culture), যার মাধ্যমে সরাসরি ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়।

আধুনিক যুগে মলিকুলার ডায়াগনস্টিকস বা পিসিআর (PCR) পরীক্ষাও বেশ নির্ভরযোগ্য। তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানে Widal পরীক্ষাকে কখনোই চূড়ান্ত রায় হিসেবে গণ্য করা হয় না।

-প্রেসপয়েন্টবিডি/স্বাস্থ্য

আরো পড়ুন….. ইন্দোনেশিয়ায় ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প, নিহত অন্তত ২০