একাদশ জাতীয় সংসদে রুমিন ফারহানা

shohrab russel

প্রকাশ :আগস্ট ২৮, ২০২৬

রুমিন ফারহানার বক্তব্যে জাতীয় সংসদে তুমুল আলোচনা

নাবিলা কবির: একাদশ জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একমাত্র নারী প্রতিনিধি হিসেবে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার উপস্থিতি ছিল সাম্প্রতিক সংসদীয় ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।

২০১৯ সালের জুনে সংরক্ষিত নারী আসন (আসন-৫০) থেকে শপথ নেওয়ার পর থেকেই তিনি সংসদে সরকারি দলের প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এককভাবে তীব্র বিরোধী কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।

যুক্তিভিত্তিক উপস্থাপনা, আইনের ধারা বিশ্লেষণ এবং সরাসরি আক্রমণাত্মক বক্তব্যের কারণে তিনি দ্রুত সংসদের মূল আকর্ষণে পরিণত হন।

​সংসদে প্রথম দিন ও স্পষ্ট অবস্থান

​সংসদে পা রেখেই রুমিন ফারহানা জানিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর অবস্থান। ২০১৯ সালের ১১ জুন নিজের প্রথম বক্তব্যে মাত্র দুই মিনিট সময় পেয়েছিলেন তিনি।

সেই সংক্ষিপ্ত সময়েই তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন:

​"আমি এমন একটি সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলছি, যে সংসদটি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত নয়।

এই সংসদ গঠিত হয়েছে ৩০ ডিসেম্বরের রাতের ভোটে। ইতিহাসের পাতায় এটি একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।"
​তাঁর এই স্পষ্ট উচ্চারণের পরপরই সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের প্রবল হট্টগোলের মুখে তাঁর মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়।

প্রথম দিনের এই ঘটনাই সংসদে তাঁর পরবর্তী ভূমিকা স্পষ্ট করে দিয়েছিল।

​দুর্নীতি ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা সংসদের বাজেট অধিবেশন এবং বিভিন্ন বিলের আলোচনায় রুমিন ফারহানা অর্থনীতি,

ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও বিদেশে অর্থপাচার নিয়ে তথ্যবহুল বক্তব্য তুলে ধরতেন।

মেগা প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধি এবং ঋণখেলাপিদের প্রসঙ্গে তাঁর একটি বহুল আলোচিত উক্তি:

​"সরকার আজ মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা দুর্নীতির মহোৎসব চালাচ্ছে।

দেশে যখন যুবসমাজের কর্মসংস্থান নেই, মানুষ নিত্যপণ্যের দামে দিশেহারা, তখন হাজার হাজার কোটি টাকা বেগমপাড়ায় পাচার হয়ে যাচ্ছে।

ব্যাংকগুলো লুটপাট করে শেষ করে দেওয়া হয়েছে।"

​তিনি বারংবার তথাকথিত "উন্নয়নের বয়ান" খণ্ডন করে দাবি করতেন যে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান না বাড়িয়ে কেবল ইট-পাথরের উন্নয়ন দেশকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে ফেলছে।

​আইনের শাসন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে বিতর্ক পেশায় আইনজীবী হওয়ায় সংসদে বিভিন্ন বিতর্কিত আইন পাসের সময় তিনি আইনগুলোর অগণতান্ত্রিক দিকগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরতেন।

বিশেষ করে 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন' নিয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট:

​"ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাইবার ক্রাইম দমনের জন্য নয়, বরং এটি তৈরি করা হয়েছে ভিন্নমত দমন ও সরকারের সমালোচনাকে স্তব্ধ করার অস্ত্র হিসেবে।

মুক্ত সাংবাদিকতা ও বাকস্বাধীনতা এই আইনের কবলে পড়ে আজ পুরোপুরি রুদ্ধ।"

​এছাড়া বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর দায়েরকৃত "গায়েবি মামলা", বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের মুক্তি

এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও তিনি সংসদে নিয়মিত আওয়াজ তুলেছেন।

​প্রতিকূল পরিবেশ ও বিতর্ক সামলানো সংসদে প্রায় ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে বিরোধী দলের সদস্য সংখ্যা ছিল হাতেগোনা।

ফলে রুমিন ফারহানা যখনই কথা বলতে দাঁড়াতেন, তখনই সরকারি দলের পক্ষ থেকে টেবিল চাপড়ানো,

বাক্যবাণ এবং মাইক দ্রুত বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটত।

তবে তিনি কখনো নিজের বক্তব্য অসম্পূর্ণ রেখে বসে পড়েননি। তিনি একাধিকবার স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতেন:
​"মাননীয় স্পিকার, বিরোধী দলের কাজ সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরিয়ে দেওয়া।

আমি এখানে সরকারের প্রশংসা গাইতে আসিনি। আমাকে আমার নির্ধারিত সময়টুকু স্বাধীনভাবে বলতে দেওয়া হোক।"

​সংসদ থেকে পদত্যাগ ​২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকার গোলাপবাগ মাঠে বিএনপির গণসমাবেশ থেকে দলের সংসদ সদস্যদের একযোগে

পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরদিন ১১ ডিসেম্বর স্পিকারের কাছে সশরীরে পদত্যাগপত্র জমা দেন রুমিন ফারহানা।

পদত্যাগকালে তিনি সংবাদমাধ্যম ও সংসদ প্রাঙ্গণে তাঁর চূড়ান্ত অবস্থান জানান:

​"যে সংসদ জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে টিকে আছে, সেই সংসদে আমাদের থাকা অর্থহীন।

জনগণের দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচন।

আমরা সংসদ বর্জন করে রাজপথে জনগণের সাথে নেমেছি।"

​রুমিন ফারহানার সংসদীয় মেয়াদ ছিল প্রায় সাড়ে তিন বছরের।

প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি দলের বিপরীতে দাঁড়িয়ে একক বাগ্মিতা ও সাহসিকতার মাধ্যমে তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধী রাজনীতির এক নতুন

মাত্রা তৈরি করেছিলেন, যা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আরো পড়ুন...

৫ সেপ্টেম্বরের লংমার্চ সফলে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের প্রস্তুতি সভা ‘লংমার্চকে ঐতিহাসিক গণসমাবেশে পরিণত করতে হবে’ – নজরুল ইসলাম