প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত চট্টগ্রামের পালেরা

প্রেসপয়েন্ট বিডি

প্রকাশ :সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬

প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত চট্টগ্রামের পালেরা

মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ মামুন সোহান, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: শরৎ শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে। বাতাসে ভেসে আসতে শুরু করেছে পূজোর গন্ধ। কাঁচা মাটির গন্ধ, বাঁশ-খড়ের কাঠামো আর কারিগরদের ব্যস্ত হাত চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রতিমালয়ে এখন এমনই দৃশ্য। হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎস তথা শারদীয় দুর্গোৎসব সামনে রেখে দেবী দুর্গাসহ বিভিন্ন প্রতিমার কাজ এগিয়ে নিতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন পালেরা। কারও মনোযোগ মুখাবয়বের সূক্ষ্ম গড়নে আবার কেউ ব্যস্ত অলংকার ও নকশার কাজে।

একটি প্রতিমা তৈরি শুধু মাটি দিয়ে কোনো অবয়ব দাঁড় করানোর কাজ নয়। এর পেছনে থাকে কয়েক ধাপের কারিগরি প্রক্রিয়া। প্রথমে প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁশ ও কাঠ দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়। সেই কাঠামোর সঙ্গে খড় ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে শরীরের আকৃতি দেওয়া হয়। পরে মাটির প্রলেপে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রতিমার অবয়ব।

সরেজমিনে দেখা যায়, চট্টগ্রামের কর্মশালাগুলোতে এখন সেই কাজই চলছে ব্যস্ত গতিতে। চট্টগ্রাম নগরের সদরঘাট, দেওয়ানজী পুকুরপাড়, বোস ব্রাদার্স লেন, হাজারী লেন, পাথরঘাটা, নালাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমা তৈরির কর্মশালা রয়েছে। এসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বংশপরম্পরায় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর দেখা মেলে। অনেক কারিগর আবার নির্দিষ্ট মণ্ডপের চাহিদা অনুযায়ী চুক্তিতে প্রতিমা তৈরির কাজ করেন।

নগরীর সদরঘাট কালীবাড়ি প্রতিমা তৈরির কর্মশালার মালিক সুজন পালের সাথে কথা বললে তিনি জানান, ”প্রতিবছরের মতো এবারও থিম প্রতিমার অর্ডার বেশি। কাঁচা মালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার এবারে প্রতিমার দামও অনেকটা বেড়েছে।”

কাজের একটি পর্যায় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় আরেকটি ধাপ। মাটির গড়ন শুকিয়ে নেওয়ার পর প্রতিমার বিভিন্ন অংশে সূক্ষ্ম কাজ করা হয়। মুখের অভিব্যক্তি, চোখের আকৃতি, হাত-পায়ের গঠন কিংবা অলংকারের নকশা প্রতিটি জায়গায় কারিগরের দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে। শেষদিকে রং ও সাজসজ্জার মাধ্যমে প্রতিমা পায় পূর্ণাঙ্গ রূপ।

প্রতিমার তৈরির কাজ কতদূর জানতে চাইলে সদরঘাট কালীবাড়ির কর্মচারী আনন্দ পাল বলেন, ”মাটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আমরা রংয়ের কাজ শুরু করবো।”

অন্যদিকে, দেওয়ানজী পুকুরপাড় প্রতিমা তৈরি কর্মশালার কর্মী অশোক পাল বলেন, ’এবারের দুর্গোৎসবকে ঘিরেও চট্টগ্রামের বিভিন্ন মণ্ডপের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে। কোথাও প্রচলিত কাঠামোর প্রতিমা, আবার কোথাও মণ্ডপের পরিকল্পনা ও সাজসজ্জার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আলাদা নকশা নিয়ে কাজ করছেন শিল্পীরা। চট্টগ্রামের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে থিমভিত্তিক আয়োজনের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।’

প্রতিমা তৈরির এই কাজে সময়ের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। মাটির স্তর বসানোর পর তা শুকানোর জন্য প্রয়োজন হয় পর্যাপ্ত সময়। এরপর রং করা, পোশাক পরানো, অলংকার সংযোজনসহ আরও কিছু কাজ থাকে। ফলে পূজার দিন যত এগিয়ে আসে, কারিগরদের কর্মব্যস্ততাও তত বাড়তে থাকে।

দেবী আর্বিভাব ঘিরে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা

চট্টগ্রামে প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই পেশা ধরে রেখেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম হাতে-কলমে শেখা কৌশলই তাদের কাজের মূল ভিত্তি। সময়ের সঙ্গে প্রতিমার নকশা ও চাহিদায় পরিবর্তন এলেও মাটি, বাঁশ, খড় ও রঙের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটি এখনো অটুট।

এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবিকার বিষয়টিও। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় দুর্গাপূজার মৌসুমে কাজের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একই সময়ে একাধিক মণ্ডপের প্রতিমার কাজ হাতে থাকলে কারিগরদের দীর্ঘ সময় কর্মশালায় কাটাতে হয়। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় চুক্তির ভিত্তিতেও প্রতিমা তৈরির কাজ করেন শিল্পীরা।

প্রতিমার মুখে শেষ তুলির আঁচড় দেওয়ার আগে পর্যন্ত তাই থামার সুযোগ কম। কারিগরদের কাছে এটি যেমন পেশা, তেমনি বহু বছরের শিল্পচর্চার অংশ। একটি মাটির অবয়বকে ধীরে ধীরে পূজার উপযোগী প্রতিমায় রূপ দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় তাদের অভিজ্ঞতা ও নৈপুণ্যই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।

চট্টগ্রামের প্রতিমালয়গুলোতে এখন সেই কর্মযজ্ঞের শেষ দিকের প্রস্তুতি চলছে। কোথাও কাঠামো গড়ার কাজ, কোথাও মাটির সূক্ষ্ম কাজ, আবার কোথাও রং ও অলংকারের প্রস্তুতি। উৎসবের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ততা আরও বাড়ছে পালের পাড়ায় ও প্রতিমা তৈরির কর্মশালাগুলোতে।

শেষ পর্যন্ত কারিগরের হাতের কাজ যখন মণ্ডপে গিয়ে স্থির হবে, তখন কয়েক সপ্তাহের শ্রম, অপেক্ষা ও সৃজনশীলতার ফল দেখা যাবে পূজার আয়োজনের মধ্য দিয়ে। মাটির সেই প্রতিমার আড়ালে থেকে যাবে চট্টগ্রামের পালদের নিরলস পরিশ্রমের গল্প।

আরো পড়ুন...

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান