স্বাস্থ্য ডেস্ক: (নাবিলা কবির: নিজস্ব প্রতিবেদক): পলিকোস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম (PCOS) কি? অ্যাপোলো হসপিটালস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, আহমেদাবাদ
পলিকোস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম (PCOS) হলো প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে দেখা দেওয়া একটি সাধারণ হরমোনজনিত ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য সমস্যা।
এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ডিম্বাশয়ে ছোট ছোট থলি বা ফলিকল জমা হওয়া, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং অনিয়মিত ঋতুস্রাব।
PCOS-এর নির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, তবে প্রধান নিয়ামকগুলো হলো:
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে গেলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়ে।
অতিরিক্ত ইনসুলিন ডিম্বাশয়কে পুরুষ হরমোন (এন্ড্রোজেন) তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করে।
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা:
অতিরিক্ত এন্ড্রোজেন এবং এলএইচ (LH) হরমোনের উপস্থিতি স্বাভাবিক ডিম্বস্ফোটনে (Ovulation) বাধা দেয়।
জীনগত প্রভাব:
পরিবারে মা বা বোনের PCOS বা ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
দীর্ঘমেয়াদী স্বল্পমাত্রার প্রদাহ (Low-grade Inflammation): শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ ডিম্বাশয়কে অতিরিক্ত এন্ড্রোজেন তৈরিতে প্ররোচিত করে।
লক্ষণ (Symptoms)
অনিয়মিত ঋতুস্রাব:
দীর্ঘ সময় পর পর পিরিয়ড হওয়া, বছরে ৮টির কম পিরিয়ড হওয়া বা মাঝে মাঝে অতিরিক্ত রক্তস্রাব।
হিরসুটিজম (Hirsutism):
মুখে, বুকে, পেটে বা পিঠে অতিরিক্ত ও ঘন কালো লোম গজানো।
ব্রণ ও তৈলাক্ত ত্বক:
বিশেষ করে থুতনি, মুখমণ্ডল ও পিঠে জেদি ব্রণ হওয়া।
ওজন বৃদ্ধি:
হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া এবং বিশেষ করে পেটের চারপাশে মেদ জমা (যা সহজে কমতে চায় না)।
অ্যান্ড্রোজেনিক অ্যালোপেসিয়া: মাথার তালুর চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা চুল পড়া।
বন্ধ্যাত্ব:
নিয়মিত ডিম্বাণু ফুটতে না পারায় গর্ভধারণে জটিলতা তৈরি হওয়া।
ইউএসজি ফাইন্ডিং (USG Findings)
পেলভিক বা ট্র্যান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসোনোগ্রাফিতে (USG) সাধারণত যে বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়:
স্ট্রিং অব পার্লস (String of Pearls): ডিম্বাশয়ের পরিধিতে ২–৯ মিলিমিটার আকারের বহুসংখ্যক (সাধারণত ১২টি বা তার বেশি) ছোট ছোট ফলিকল সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করে, যা দেখতে মুক্তার মালার মতো লাগে।

ওভারিয়ান ভলিউম বৃদ্ধি: ডিম্বাশয়ের আকার স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয়ে যায় (সাধারণত ১০ মিলিলিটারের বেশি)।
কেন্দ্রীয় স্ট্রোমার ঘনত্ব:
ডিম্বাশয়ের মধ্যভাগের টিস্যু (Stroma) স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘন ও উজ্জ্বল দেখায়।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা (Investigations)
১. হরমোন প্রোফাইল:
টেস্টোস্টেরন (Testosterone), এলএইচ (LH), এফএসএইচ (FSH), প্রোল্যাকটিন (Prolactin) ও থাইরয়েড (TSH) লেভেল নির্ণয়।
২. রক্তের শর্করা পরীক্ষা:
ফাস্টিং গ্লুকোজ, ওজিটিটি (OGTT) এবং ফাস্টিং ইনসুলিন পরীক্ষা।
৩. লিপিড প্রোফাইল:
রক্তে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা যাচাই।
৪. পেলভিক আল্ট্রাসোনোগ্রাফি (USG):
ডিম্বাশয়ের গঠন ও আকৃতি পর্যালোচনার জন্য।
ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা (Management)
PCOS পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক জীবনযাত্রা ও চিকিৎসায় এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়:
জীবনযাত্রার পরিবর্তন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ step):
ওজন নিয়ন্ত্রণ:
শরীরের মোট ওজনের ৫–১০% কমাতে পারলে পিরিয়ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়মিত হতে শুরু করে।
সুষম খাদ্যভ্যাস:
রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট ও প্রসেসড ফুড এড়িয়ে শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া।
নিয়মিত ব্যায়াম:
সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করা।
মেডিকেল চিকিৎসা:
পিরিয়ড নিয়মিত করতে:
ডাক্তার নির্ধারিত কম্বাইন্ড ওরাল কনট্রাসেপ্টিভ পিল (OCP) বা প্রজেস্টেরন থেরাপি।
ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়াতে:
মেটফর্মিন (Metformin) জাতীয় ওষুধ।
গর্ভধারণের জন্য:
ডিম্বস্ফোটন উদ্দীপক ওষুধ (যেমন—লেট্রোজোল বা ক্লোমিফেন)।
অতিরিক্ত লোম ও ব্রণের জন্য: অ্যান্টি-এন্ড্রোজেন ওষুধ।
পরামর্শ: সঠিক সময়ে এটি শনাক্ত করে নিয়মিত চিকিৎসায় থাকলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
-প্রেসপয়েন্টবিডি/ম্বাস্থ্য













