মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ মামুন সোহান,চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের পটিয়ায় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সাদিয়া সুলতানা সেতু (২১) নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে।
স্বজনদের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর জটিলতা দেখা দিলেও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ব্যবস্থা না পাওয়ায় তার অবস্থার অবনতি হয়। তবে চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, আকস্মিক প্রসবোত্তর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা পোস্টপার্টাম হেমোরেজের (পিপিএইচ) কারণে সাদিয়ার মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে পটিয়া সদরের শেভরন হসপিটালে। নিহত সাদিয়া পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও ইউনিয়নের ছত্তর মার্কেট এলাকার বাসিন্দা এবং প্রবাসী জসিম উদ্দিনের স্ত্রী। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাদিয়া প্রথমবারের মতো মা হতে যাচ্ছিলেন। তার নবজাতক সন্তান বর্তমানে সুস্থ রয়েছে।
স্বজনরা জানান, গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাত ৩টার দিকে প্রসববেদনা নিয়ে সাদিয়াকে শেভরন হসপিটালে ভর্তি করা হয়। পরদিন রোববার দুপুর আড়াইটার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মিনি বড়ুয়ার নেতৃত্বে তার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর থেকেই সাদিয়ার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে রক্তক্ষরণ বাড়তে থাকায় তার শারীরিক অবস্থারও দ্রুত অবনতি ঘটে। স্বজনদের দাবি, পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ার পরও রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব করা হয়। একই সঙ্গে রোগীর প্রকৃত শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তারা।
পরে সাদিয়ার অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার রাত ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয় বলে স্বজনরা জানান।
নিহতের ভাই আরিফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তার বোন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় সুস্থ ছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হওয়ার পর দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হলে হয়তো তাকে বাঁচানো সম্ভব হতো।
তবে পরিবারের এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন চিকিৎসক ডা. মিনি বড়ুয়া। তার দাবি, সাদিয়ার চিকিৎসায় কোনো অবহেলা হয়নি। সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর রোগীর পোস্টপার্টাম হেমোরেজ দেখা দেয়। পটিয়ায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসুবিধা সীমিত হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাদিয়া ১২ সেপ্টেম্বর রাত ৩টায় হাসপাতালে ভর্তি হন। তখন তার প্রসববেদনা ছিল এবং জরায়ুর মুখ প্রায় দেড় সেন্টিমিটার খোলা ছিল। শুরুতে স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করা হয়। পরে জরায়ুর মুখ পুরোপুরি খোলার পরও শিশুর মাথা নিচে না নামায় এবং শিশুর মাথায় ফোলা দেখা দেওয়ায় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
হাসপাতালের দাবি, পরিবারের সম্মতি নিয়েই অস্ত্রোপচার করা হয় এবং অপারেশনের সময় উল্লেখযোগ্য কোনো জটিলতা দেখা যায়নি। তবে অস্ত্রোপচারের প্রায় দুই ঘণ্টা পর রোগীর যোনিপথে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এরপর পিপিএইচ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ওষুধ এবং দুই ইউনিট রক্ত দেওয়ার কথা জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় উন্নত চিকিৎসার জন্য সাদিয়াকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থানান্তরের সময় রোগীর জন্য অতিরিক্ত দুই ইউনিট রক্তও সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
এদিকে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শেভরন হসপিটাল। কমিটিতে রয়েছেন ডা. এমদাদুল হাসান, ডা. আনজুমান নিগাদ উর্মি এবং ডা. প্রহর উল আলম। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জিয়াউল হক জানিয়েছেন, পুলিশ বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রসূতির মৃত্যুকে ঘিরে একদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করে পিপিএইচকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফলে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনই এ ঘটনায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি বা অবহেলা ছিল কি না, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। আপাতত তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষের অভিযোগকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।













