জয়শ্রী রানী: খেলাধুলা জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলো ফুটবল।
ফুটবলের উৎপত্তি ১৯ শতকের মাঝামাঝি ইংল্যান্ডে হলেও বর্তমানে তা বর্তমানে তা সারা বিশ্বে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম ফুটবল সংস্থা (The Football Association) গঠিত হয় এবং খেলার নির্দিষ্ট নিয়মকানুন প্রণীত হয়।
অন্যদিকে, ১৯০৪ সালে ফুটবলের আন্তর্জাতিক পরিচালনা সংস্থা ফিফা (FIFA) প্রতিষ্ঠিত হয় (সূত্র: উইকিপিডিয়া)।
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসের কথা বললে একটি দেমের নাম প্রথমেই আসে উরুগুয়ে।
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজন করা হয়।
ঐসময় বিশ্বের ২০০ টিরও বেশি দল অংশ নেয় এবং স্বাগতিক দেশ উরুগুয়ে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
ফিফা বিশ্বকাপের বর্তমান চিত্র:
২০২৬ সালে ফিফা বিশ্বকাপ ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ফিফার ইতিহাসে এই প্রথম তিনটি দেশ একত্রে বিশ্বকাপের আয়োজন করছে।
এটি ফুটবল ইতিহাসে প্রথম আসর যেখানে ৩২টির পরিবর্তে রেকর্ড ৪৮টি দেশ অংশগ্রহণ করছে। দলগুলো ১২টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মোট ১০৪টি ম্যাচে লড়াই করবে।
ফিফার অর্থনীতি অবস্থা পরিচালিত হয় মূলত ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে। সম্প্রচার স্বত্ব (Broadcasting Rights)
এবং মার্কেটিং থেকে আসা বিলিয়ন ডলারের আয় দিয়ে ফিফা সারা বিশ্বে ফুটবল উন্নয়ন ও টুর্নামেন্ট পরিচালনা করে থাকে।
ফিফার আয়ের প্রধান উৎস হলো Broadcast বা টিভি সম্প্রচার। টিভি সম্প্রচারের মাধ্যমে ফিফা তার মোট আয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ এখান থেকে পেয়ে থাকে।
এছাড়া মার্কেটিং এবং স্পনসরশিপ,টিকিট ও হসপিটালিটি, লাইসেন্সিং দ্বারাও ফিফা আয় করে থাকে।
ফিফা প্রতিবছর প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
আয়োজক দেশে অর্থনৈতিক প্রভাব:
বিশ্বকাপ আয়োজক দেশগুলোর জন্য সরাসরি লাভ এবং পর্যটন খাতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি আনে।
বিশ্বকাপ আয়োজন একটি দেশের স্থানীয় অর্থনীতি ও অবকাঠামোর জন্য সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে।
২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করে কাতার।
আয়োজনে আনুমানিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো প্রত্যক্ষ আয় হয়েছিল এই দেশের যা মূলত পর্যটন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন অবকাঠামো থেকে এসেছে।
যদিও বিশ্বকাপ আয়োজনে কাতারের পরিকাঠামোগত ব্যয় ছিল প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার।
তবে এই বিনিয়োগ দেশটির জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যায়নের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ ছিল।
এই আয়োজনে কাতারের প্রধান অবকাঠামোগত ব্যয় শুধুমাত্র এই সুবিশাল আয়োজনের উপরই নয়,
বরং জিডিপি প্রবৃদ্ধি, শ্রম বাজার এবং পর্যটন খাতের উপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।
ফিফা বিশ্বকাপের মতো এতো বড় ক্রীড়া আয়োজনের অর্থনৈতিক প্রভাব বহুমুখী এবং এতে বেশ কিছু জটিল বিষয় জড়িত ছিলো।
কাতারের জন্য, এই আয়োজনে অংশগ্রহণ তাদের বৈচিত্র্যময় অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
এছাড়াও, এটি দেশের তেল রাজস্বের উপর নির্ভরতা কমানোর একটি ভালো উপায়
[ 11 ]।
এতে একটি মূল প্রশ্ন উঠে আসে: ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ কাতারের জাতীয় অর্থনীতিতে কী কী নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ফলাফল প্রদান করে? তাৎপর্যপূর্ণ এবং আগ্রহের বিষয় হলো,
কাতারে বিশ্বকাপের প্রভাবের উপর খুব কম সংখ্যক গবেষণাই করা হয়েছে, যদিও দেশটির অনন্য অর্থনৈতিক এবং সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে এই শূন্যতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ,
যা অন্যান্য আয়োজক দেশগুলোর সাথে সরাসরি তুলনা করা কঠিন করে তোলে।
[ 12 ]।
আয়োজক দেশ কি আসলে লাভবান?
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো।
আয়োজক দেশ তিনটির আনুমানিক মোট খরচ ১২ বিলিয়ন ডলারের ($12 billion) বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যেখানে শুধু কানাডার মাত্র ১৩টি ম্যাচ আয়োজনেই খরচ হতে পারে ১ বিলিয়ন ডলারের ($1 billion) বেশি। অন্যদিকে, সবচেয়ে বেশি ম্যাচ
ও ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে বলে সর্বোচ্চ ব্যয়ের চাপ রয়েছে এই দেশে।
যুক্তরাষ্ট্রের সোফি স্টেডিয়াম যা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্টেডিয়াম। এটি নির্মাণ করতে প্রায় $৫.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়েছিল।
এবারের বিশ্বকাপে এই মাঠে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী ম্যাচসহ মোট ৮টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
যদিও স্টেডিয়ামগুলো আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল তবে ফিফার কঠোর নিয়ম মেনে কৃত্রিম ঘাস সরিয়ে আসল ঘাসের পিচ বসানো, স্টেডিয়ামের আসন বিন্যাস পরিবর্তন করা
এবং ভিআইপি হসপিটালিটি বক্স বাড়ানোর জন্য ভেন্যু ভেদে প্রতিটি স্টেডিয়ামে কয়েক মিলিয়ন থেকে শুরু করে শত মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সংস্কার কাজের পেছনে খরচ করতে হচ্ছে।

কিছু ভেন্যুতে ভক্তদের ইতিমধ্যেই বেশ খরচের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে টিকিটের পরিবর্তনশীল মূল্য, ২০০ ডলারের বেশি পার্কিং ফি
এবং স্টেডিয়ামে যাওয়ার জন্য বিশেষ পরিবহন ভাড়া।
বিশ্বকাপ আয়োজন করা অর্থনৈতিক, পর্যটন এবং ভাবমূর্তির দিক থেকে সুফল বয়ে আনলেও এটি একটি বিশাল আর্থিক চ্যালেঞ্জও বটে।
টুর্নামেন্টের জন্য নির্মিত বা উন্নত করা অবকাঠামোটি যেন পরবর্তীতেও কার্যকর থাকে
এবং আয়োজক শহরগুলোর জন্য বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা।
২০২৫ সালের ফিফার একটি সমীক্ষা অনুসারে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৭.২ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করবে
এবং আনুমানিক ১,৮৫,০০০ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, যদিও এর মধ্যে অনেকগুলোই অস্থায়ী চাকরি হতে পারে।
এই চাকরিগুলো আতিথেয়তা, পর্যটন, নিরাপত্তা এবং খুচরা ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে তৈরি হবে।
প্রতিটি মার্কিন আয়োজক শহরে ১৬০ মিলিয়ন থেকে ৬২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিটি শহরের স্থানীয় ব্যবসা, বিশেষ করে পর্যটন ও আতিথেয়তা শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসাগুলো
এবং স্টেডিয়ামের কাছাকাছি অবস্থিত ব্যবসাগুলোর রাজস্বে ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে, এপ্রিলের শুরু থেকে কিছু শহরে হোটেল কক্ষের প্রত্যাশিত চাহিদা দেখা যায়নি।
এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য এখনকার কঠোর নিয়মকানুন ও ক্রমবর্ধমান বিমান ভাড়ার কারণে,
এমন জল্পনা রয়েছে যে মার্কিন বিশ্বকাপ ম্যাচগুলিতে আন্তর্জাতিক দর্শকের উপস্থিতি প্রাথমিকভাবে যতটা অনুমান করা হয়েছিল ততটা নাও হতে পারে।
ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের একটি বড় সুবিধা হলো পর্যটন।
বিশ্বকাপের কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আয়োজক দেশে ভিড় জমায়।
ফলে স্থানীয় হোটেল এবং রেস্তোরাঁগুলি অর্থ উপার্জন করে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি গতিশীল হয়।
সুতরাং, বিশ্বকাপ আয়োজন লাভজনক হতে পারে যদি আয়োজক দেশটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে।
পর্যটন, অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংকে কাজে লাগাতে পারলেই বিশ্বকাপ অর্থনৈতিক সফলতা এনে দেয়।
-প্রেসপয়েন্টবিডি/খেলাধুলা/অর্থনীতি
আরো পড়ুন....https://presspointbd.com/ott-platform-changing-cinema-perception/













