কবিতা রানী: ভারতে জাতিভেদ প্রথার উৎপত্তি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
ভারতে বর্ণের উপর ভিত্তি করে জাতিভেদ বা সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের উৎপত্তি হয়।
মূলত, মধ্যযুগের প্রারম্ভিক সময়ে জাতিভেদের ধারণা উঠে আসে তবে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন এবং
ব্রিটিশ রাজ প্রতিষ্ঠার পরে ভারতে জাতিভেদ প্রথা ঐতিহ্যগতভাবে হিন্দুধর্মের সাথে যুক্ত হয়ে যায়।
ভারতে জাতিভেদ প্রথার উৎপত্তির ইতিহাস:
আদি বৈদিক যুগ বা প্রাচীন ভারতে কর্ম ও দক্ষতার ভিত্তিতে জাতিভেদ প্রথার উৎপত্তি হয়।
যেমন: পৌরহিত বা শিক্ষাদানের সাথে যুক্তরা হয় ব্রাক্ষণ, যুদ্ধবিদ্যা , শাষণ বা যোদ্ধারা হয়ে যায় ক্ষত্রিয়।
আবার ব্যবসায় জড়িতরা হয় বৈশ্য এবং শ্রমিক বা পরিচ্ছন্নাতা কর্মে যারা যুক্ত তারা হয় শূদ্র।
সমাজকে সচল রাখার জন্য কাজের ভিত্তিতে ৪টি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল জাতিবাদ।
এই যুগে এক বর্ণের মানুষ চাইলে তার কর্ম ও মেধার গুণে অন্য বর্ণে যেতে পারত অর্থাৎ, জন্ম নয়, কর্মই ছিল জাতি নিধারর্ণের মূল মাপকাঠি।
তবে, ভারতে জাতিভেদ প্রথার চিত্র বদলে যায় উত্তর বৈদিক যুগ ও মধ্যযুগের দিকে। এসময় জন্মগত বা বংশানুক্রমে জাতিভেদ চিহ্নতকরণ শুরু হয়ে যায়।
অর্থাৎ ব্রাক্ষণের সন্তান ব্রাক্ষণ এবং শূদ্রের সন্তান শূদ্র হিসেবেই বিবেচিত হতে থাকে।
সমাজে চরম বৈষম্য তৈরি হয় এসময়। "অস্পৃশ্যতা" বা ছোঁয়াছুঁয়ির মতো কুপ্রথার জন্মও ঠিক এই সময়েই।
ব্রাক্ষণ:
উচ্চবর্ণ হিসাবে গণ্য হয় এই বর্ণের শ্রেণীতে থাকা ব্যক্তিবর্গরা।বেদ অধ্যয়ন করার অধিকার একমাত্র ব্রাক্ষণদের ছিল।
যারা কর্ম ও আচরণের গুণে ব্রহ্মলাভের জন্য যথার্থভাবেই পবিত্রতা, বুদ্ধি এবং জ্ঞানে ভূষিত হন।
ব্রাহ্মণদেরকে ধর্মের রক্ষক ও মুখপাত্র হিসেবে কর্তৃত্ব, আস্থা এবং দায়িত্ব অর্পণ করা হতো।
ক্ষত্রিয়:
প্রাচীন ভারতের বাহুবলী যারা যুদ্ধ ও শাষণ ব্যবস্থার সাথে যুক্ত ছিলেন। সমাজে আইন শাস্ত্র মেনে শাষনকার্য পরিচালানা , ন্যায়বিচার করা এবং সকলের জন্য সুশাসন, শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয় ছিলো তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।
বৈশ্য:
যারা ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি এবং কৃষি সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের অধিকার পায় তারা বৈশ্য শ্রেণীভুক্ত হন।
তাদের গবাদি পশু চরানো, দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলিদান করা, বেদ অধ্যয়ন করা, ব্যবসা-বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করা, অর্থ ধার দেওয়া এবং জমি চাষ করার বিধান রয়েছে।
শূদ্র:
উত্তর বৈদিক যুগ ও মধ্যযুগে নিচু বর্ণ ছিলো শূদ্র বর্ণ। তিনটি বর্ণের সেবা করা তাদের প্রাধান কর্তব্য ছিল।
তাদের বেদ অধ্যয়ন, পবিত্র মন্ত্র শ্রবণ, কোনো বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান বা সংস্কারে অংশগ্রহণ বা সম্পাদনের অনুমতি ছিল না।
তাদের বেদ অধ্যয়ন, এমনকি পবিত্র মন্ত্র শ্রবণেরও অনুমতি ছিল না।
সামাজিক অনুষ্ঠানে উচ্চ বর্ণের সঙ্গে মেলামেশা করা বা তাদের সাথে খাবার খাওয়ারও অনুমতি তাদের ছিল না।
তারা হয়তো তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী স্থানীয় ও গ্রাম্য দেব-দেবীর পূজা করত।
ঐতিহাসিক ও আর্য আক্রমণ তত্ত্ব:
ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে মধ্য এশিয়া থেকে আর্যরা যখন উত্তর ভারতে আসে তখন মূলত জাতিপ্রথার রুপ বদলে যায়।
স্থানীয়রা ছিল কৃষ্ণবর্ণের এবং আর্যরা ছিলো ফর্সা তথা ফর্সারা শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে এবং সামাজিক বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে নিজেদের উচ্চ বণের দাবি করা শুরু করে। এবং কৃষ্ণকায়রা হয়ে যায় চতুর্থ বর্ণ বা শূদ্র বর্ণের।
অন্যদিকে, সমাজবিজ্ঞানী জন সিসিল নেসফিল্ডের বলছেন, কাস্ট সিস্টেমের মূল ভিত্তি ছিল মানুষের পেশা। প্রাচীন সমাজে শ্রমের বিভাজন (Division of Labor) অত্যন্ত জরুরি ছিল।
সমাজকে সচল রাখতে একেক দল মানুষকে একেকটি নির্দিষ্ট কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ভারতে জাতিভেদ প্রথার বর্তমান চিত্র:

ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৭ মতে, অস্পৃশ্যতা ও জাত পাতের ভিত্তিতে যেকোনো বৈষম্যকে বেআইনি ঘোষণা করা হলেও ছোঁয়াছুতের ব্যাপার সম্পূর্ণ মুছে দেয়া সম্ভব হয় নি।
অনেক পরিবারে এখনো আন্তঃবর্ণ বিবাহ অনুমোদিত বা স্বীকৃত নয়। অর্থাৎ ব্রাক্ষণের মেয়েকে অন্য বর্ণের সাথে বিয়ে দেয়া প্রায় অসম্ভব।
গ্রামীণ এলাকা এবং কলেজ ক্যাম্পাসে বর্ণগত সংঘাত প্রায়শই সহিংসতা ও রক্তপাতের দিকে নিয়ে যায়।
অনেক হিন্দু মন্দিরে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়, বর্ণভিত্তিক বৈষম্য প্রচলিত আছে। সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত জনপ্রিয় মন্দিরগুলোসহ বেশিরভাগ মন্দিরই পুরোহিতের দায়িত্বের জন্য ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কাউকে নিয়োগ করে না।
পুরোহিত পদটি ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া অধিকার হিসেবেই রয়ে গেছে এবং শৈব ধর্ম ছাড়া অন্য কোথাও অন্যদের বেদ অধ্যয়ন ও পুরোহিতের দায়িত্ব গ্রহণে উৎসাহিত করার জন্য কোনো উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা করা হয়নি।
বর্তমান সময়ে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে ভারত এগিয়ে গেলেও বর্ণপ্রথা বা জাতি ভেদাভেদে শিকলে আঁকড়ে আছে।
-প্রেসপয়েন্টবিডি/শিক্ষা/সংস্কৃতি













