অতিন বিশ্বাস: ঢাকার সাভারের শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় একটি ভাড়া বাসার তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে এক পরিবারের তিন সদস্যের রক্তাক্ত ও গলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
নিহতদের মধ্যে স্বামী, স্ত্রী ও তাদের এক অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান রয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর পুরো এলাকা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্থানীয়দের মাঝে চরম আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ:
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার একটি বহুতল ভবনের চারতলার ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে গত দুই দিন ধরে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না।
ফ্ল্যাটটির দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল।
ঘটনার দিন সকালের দিকে কক্ষটি থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে আশপাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সন্দেহ হয়।
তারা বিষয়টি বাড়ির মালিককে অবহিত করেন।
বাড়ির মালিকের কাছ থেকে খবর পেয়ে আশুলিয়া থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
পুলিশ ফ্ল্যাটের প্রধান দরজার তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে খাটের ওপর পড়ে থাকা তিনটি মরদেহ দেখতে পায়। মরদেহগুলো ততক্ষণে বিকৃত হতে শুরু করেছিল এবং ঘরের মেঝেতে রক্তের দাগ শুকিয়ে ছিল।
প্রাথমিক সুরতহাল শেষে পুলিশ জানায়, নিহতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত দুই থেকে তিন দিন আগে দুর্বৃত্তরা তাদের হত্যা করে ঘরের বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যায়।
সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ করেছে এবং মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের মন্তব্য
হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
তবে পূর্ব শত্রুতা, পারিবারিক কলহ নাকি কোনো ডাকাতির উদ্দেশ্যে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একই তলার প্রতিবেশী মো. রফিকুল ইসলাম আতঙ্কিত কণ্ঠে বলেন:
"উনারা অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। কারো সাথে কখনো কোনো উচ্চবাচ্য হতে দেখিনি।
গত দুদিন ধরে ওদের ঘর বন্ধ দেখে ভেবেছিলাম হয়তো গ্রামের বাড়ি গেছেন। কিন্তু সকালে যখন তীব্র পচা গন্ধ বের হতে লাগল, তখন আমরা বাড়ির মালিককে ডাকি। এমন নৃশংস ঘটনা আমাদের চোখের সামনে ঘটবে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না।
পুরো ভবনের পরিবারগুলো এখন আতঙ্কে আছে।"
বাড়ির মালিক এ কে এম শামসুল হক এ বিষয়ে জানান:
"নিহত ব্যক্তিরা গত প্রায় আট মাস ধরে আমার ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকছিলেন।
তারা নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করতেন এবং তাদের চলাফেরায় কখনো কোনো সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েনি।
আজ সকালে ভাড়াটিয়ারা দুর্গন্ধের কথা জানালে আমি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে খবর দিই।
আমরা এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।"
পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্য
চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ, ডিবি ও র্যাবের একাধিক দল মাঠে নেমেছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন:
"আমরা তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছি।
প্রাথমিকভাবে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেই মনে হচ্ছে।
নিহতদের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে।
কী কারণে এবং কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা উদ্ঘাটনে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে।ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর সঠিক সময় ও কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।"
শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় প্রায়শই এমন অপরাধমূলক ঘটনার পুনরাবৃত্তি স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।
এই ত্রিপল মার্ডারের নেপথ্যের কারণ দ্রুত উন্মোচন করে দোষীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।













