সৈয়দ আতিক ফয়সাল, রাবি প্রতিনিধি:
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের নৃশংস হামলার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রম নিয়ে চরম ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উচ্চতর তদন্ত কমিটি এখনো তাদের কাজই শুরু করতে পারেনি।
সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট প্রমাণ ও প্রথম দফার তদন্তে কয়েকজনের নাম উঠে আসার পরও মূল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে তদন্তের নামে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকদের।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সাময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এতে ‘আগামীর সময়’-এর প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম, ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল, ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এর প্রতিনিধি আরিফ উজ্জামান কোরবান ও ‘সমকাল’-এর প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজুসহ অন্তত ১০ জন সাংবাদিক আহত হন। আহত সাংবাদিকরা বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হামলায় সরাসরি অংশ নেন অন্তত ১০ জন। এর নেতৃত্বে ছিলেন শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবীব (আইন বিভাগ, ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ), যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম (ইতিহাস বিভাগ, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ), সহ-সভাপতি শরিফুল ইসলাম (নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ), সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ও বর্তমানে ছাত্রদলে সক্রিয় বিশাল চক্রবর্তী (অর্থনীতি বিভাগ, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ), সহ-দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম অথি (সঙ্গীত বিভাগ, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ), সহ-সভাপতি তাকবীর হাসান ইমন (আইবিএ, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ) এবং ছাত্রদলকর্মী সৈয়দ সাহজারুল ইসলাম (ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, ২০১৯-২০) ও তানিম রহমান (গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ২০২৫-২৬)। হামলার সময় আশেপাশে আরও অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জন ছাত্রদল নেতাকর্মী মহড়া দেন।
ঘটনার ২৪ ঘন্টা পার হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক রেজাউল করিম-২ কে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ভিডিও ও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও হল প্রশাসন একটি অজ্ঞাতনামা মামলা করে। এরপর তদন্ত কমিটি গত ৯ অক্টোবর শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম এবং কর্মী বিশাল চক্রবর্তী ও ফেসবুকে উষ্কানি দেওয়ার দায়ে সাময়িক বহিষ্কারের সুপারিশ করে।
অন্যদিকে রাকসুর সহকারী সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম, ছাত্রদল সহ-সভাপতি তাকবীর আহমেদ ইমন, কর্মী সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম ও তানিম রহমানের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্তের কথা বলা হয়। এ ছাড়া সহ-সভাপতি বুলবুল রহমান, শরিফুল ইসলাম ও দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলমকে কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরপর গত ১৫ অক্টোবর সিন্ডিকেটের ৫৫০ তম সভায় তদন্ত কমিটর সুপারিশ গৃহীত হয়। এবং ফার্মেসী বিভাগের অধ্যাপক গোলাম সাদিককে আহবায়ক করে ৫ সদস্যের একটি অধিকতর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তদন্ত কমিটি গঠনের প্রায় ১০ দিন পার হলেও এখনো কাজ শুরু করেনি তারা। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে উচ্চতর তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক গোলাম সাদিক বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমাদের কাছে চিঠি জমা পড়েছে। এখনও কাজ শুরু করা হয়নি। কবে নাগাদ শেষ করতে পারব তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে আমরা যত দ্রুত সম্ভব কাজ শুরু করার চেষ্টা করব।’
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি, কমিটি কাজ করছে। হামলাকারীরা যেন পুনরায় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে কোনো অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনায় তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা, প্রতিবেদন জমার সময় এবং হামলার অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন। তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।














