কেন গাড়ি কম চলছে কর্ণফুলী টানেলে!

প্রেসপয়েন্ট বিডি

প্রকাশ :অক্টোবর ৮, ২০২৬

কেন গাড়ি কম চলছে কর্ণফুলী টানেলে!

মো: আব্দুল্লাহ মামুন সোহান,চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম টানেল চালুর প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাশিত মাত্রায় যানবাহন চলাচল করছে না। বিপুল ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামো থেকে যে পরিমাণ যান চলাচল ও অর্থনৈতিক সুফল প্রত্যাশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তার অনেক কম দেখা যাচ্ছে। ফলে টানেলের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটাতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, টানেল দিয়ে বর্তমানে দৈনিক কয়েক হাজার যানবাহন চলাচল করছে। অথচ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি যান চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে ভারী পণ্যবাহী যানবাহন টানেলটি তুলনামূলকভাবে কম ব্যবহার করছে।

টোল কি বড় বাধা?

টানেল ব্যবহারে অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো টোল। অনেক চালক ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের কাছে টোলের পরিমাণ অতিরিক্ত হওয়ায় বিকল্প রুট ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। তবে শুধু টোলকেই কম যান চলাচলের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কারণ, টোল কম হলেও যদি টানেল ব্যবহারের পর গন্তব্যে যাওয়ার সড়ক সুবিধাজনক না হয়, তাহলে দূরপাল্লার যানবাহনের জন্য টানেল ব্যবহার করে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের সুবিধা সীমিত থাকে।

কক্সবাজারমুখী সরাসরি সংযোগের ঘাটতি

টানেলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা ছিল চট্টগ্রাম শহর থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ তৈরি করা। কিন্তু টানেল পার হওয়ার পর বিদ্যমান সড়ক নেটওয়ার্ক সব ধরনের দূরপাল্লার যানবাহনের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধাজনক নয়।

এই সমস্যার সমাধানে আনোয়ারা থেকে চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩৬ কোটি টাকা। এটি বাস্তবায়িত হলে টানেল ব্যবহার করে কক্সবাজার যেতে প্রায় ৩০ মিনিট সময় কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন।

অর্থাৎ, টানেল তৈরি হলেও এর সঙ্গে যুক্ত পুরো সড়ক নেটওয়ার্ক একই গতিতে সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—যা যানবাহন আকর্ষণের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারী পণ্যবাহী গাড়ি কেন কম যাচ্ছে?

কর্ণফুলী টানেলকে ঘিরে বড় প্রত্যাশা ছিল চট্টগ্রাম বন্দর, দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারমুখী পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় গতি আনা। কিন্তু বর্তমানে ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের একটি বড় অংশ টানেল এড়িয়ে চলছে।

এর ফলে টানেলের সম্ভাব্য বাণিজ্যিক ব্যবহার পুরোপুরি তৈরি হয়নি। অন্যদিকে দক্ষিণ চট্টগ্রামে বড় শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়তে না পারায় ভারী যানবাহনের স্বাভাবিক প্রবাহও তৈরি হয়নি।

টানেল তৈরি হয়েছে, কিন্তু ‘দুই শহর’ ধারণা কতটা বাস্তব?

কর্ণফুলী টানেলের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নদীর দুই পাড়ের যোগাযোগ সহজ করে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ ধারণাকে এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু টানেলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সড়ক, শিল্পাঞ্চল ও অন্যান্য অবকাঠামোর সমন্বিত উন্নয়ন প্রত্যাশিত গতিতে না হওয়ায় সেই লক্ষ্য পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

ফলে টানেল নিজে একটি বড় অবকাঠামো হলেও এর ব্যবহার নির্ভর করছে আশপাশের সড়ক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর।

আয় কম, পরিচালনা ব্যয় বেশি

কম যান চলাচলের সরাসরি প্রভাব পড়ছে টানেলের আয়-ব্যয়ের হিসাবে। ২০২৬ সালের জুনে সংসদে দেওয়া তথ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, টানেল থেকে মাসে গড়ে প্রায় ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা টোল আদায় হচ্ছে। বিপরীতে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

সাম্প্রতিক বাসস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানেল থেকে সরকারের মাসিক গড় লোকসান প্রায় ৩ কোটি ৫৮ লাখ থেকে ৪ কোটি টাকা। এই পরিস্থিতিতে টানেল ব্যবহার বাড়াতে বিকল্প সড়ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সমাধান কোথায়?

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু টোল কমিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। টানেলের সঙ্গে সংযুক্ত সড়কগুলো উন্নত করা, কক্সবাজারমুখী সরাসরি যোগাযোগ তৈরি, দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়ানো এবং ভারী পণ্যবাহী যানকে টানেল ব্যবহারে কার্যকর সুবিধা তৈরি—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

অর্থাৎ, কর্ণফুলী টানেলে কম যান চলাচলের পেছনে টোল একটি কারণ হলেও মূল সমস্যা বৃহত্তর যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের ঘাটতি। টানেলকে কেন্দ্র করে সংযোগ সড়ক ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কতটা দ্রুত গড়ে ওঠে, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে এই বড় অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ ব্যবহার।

আরো পড়ুন...

চট্টগ্রামে হকার উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে প্রশ্ন, স্থায়ী সমাধান চান নগরবাসী