জয়শ্রী রানী, নিজস্ব প্রতিবেদক: হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব গণেশ চতুর্থী। ভগবান গণেশের জন্মতিথি হিসেবে পালিত এই উৎসব ঘিরে প্রতিবছর তৈরি হয় ধর্মীয় আবহ ও উৎসবের আমেজ। জ্ঞান, বুদ্ধি, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে গণেশের আরাধনা করেন ভক্তরা। নতুন কোনো কাজ শুরুর আগে তাঁর আশীর্বাদ নেওয়ার রীতিও হিন্দু সমাজে দীর্ঘদিনের।
আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ভারতসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় পালিত হবে গণেশ চতুর্থী। পঞ্জিকা অনুযায়ী, এদিন সকাল ৭টা ৩৬ মিনিটে চতুর্থী তিথি শুরু হয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ১৪ মিনিটে শেষ হবে। চট্টগ্রামে মধ্যাহ্নকালীন গণেশ পূজার শুভ সময় সকাল ১০টা ৩৪ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ২ মিনিট পর্যন্ত। ঢাকার ক্ষেত্রে এই সময় সকাল ১০টা ৪০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৮ মিনিট।
কেন গুরুত্বপূর্ণ গণেশ চতুর্থী
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে গণেশকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবতা হিসেবে দেখা হয়। তাঁকে ‘বিঘ্নহর্তা’ও বলা হয়—অর্থাৎ যিনি জীবনের নানা বাধা দূর করেন। এ কারণে শিক্ষা, ব্যবসা, কর্মজীবন কিংবা নতুন কোনো উদ্যোগের আগে গণেশের পূজা করার প্রচলন রয়েছে।
গণেশ চতুর্থীর মূল তাৎপর্য তাই কেবল একটি দেবতার পূজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভক্তদের বিশ্বাসে এটি নতুন সম্ভাবনা, শুভবুদ্ধি এবং সাফল্যের জন্য প্রার্থনার একটি বিশেষ দিন। পরিবারে শান্তি, জীবনে সমৃদ্ধি এবং প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার আশায় অনেকে এই দিনে উপবাস ও বিশেষ প্রার্থনা করেন।
ঘরে ঘরে পূজা, মণ্ডপে উৎসব

গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে বিভিন্ন বাড়ি, মন্দির ও পূজামণ্ডপে গণেশের প্রতিমা স্থাপন করা হয়। ফুল, ফল, মিষ্টি ও নানা পূজাসামগ্রী দিয়ে সাজানো হয় পূজার স্থান। ভক্তরা মন্ত্রোচ্চারণ, আরতি ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার পালন করেন।
গণেশের সঙ্গে মোদকের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে ধর্মীয় সংস্কৃতিতে। তাই অনেক জায়গায় পূজার নৈবেদ্যে মোদকসহ বিভিন্ন মিষ্টান্ন রাখা হয়। কোথাও আবার স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও।
শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, অনেক মানুষের কাছে গণেশ চতুর্থী পরিবার ও সমাজের মানুষের একত্র হওয়ারও একটি উপলক্ষ। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের অংশগ্রহণে পূজাকে ঘিরে তৈরি হয় আনন্দঘন পরিবেশ।
উৎসবের বিস্তার ও প্রতিমা বিসর্জন
গণেশ চতুর্থী বিশেষভাবে বড় আকারে পালিত হয় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। কোথাও কয়েক দিন ধরে চলে গণেশোৎসব। প্রতিমা স্থাপনের পর নিয়মিত পূজা ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসব এগিয়ে যায়। শেষ পর্যায়ে ধর্মীয় রীতি মেনে গণেশের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের পঞ্জিকা অনুযায়ী গণেশ বিসর্জনের দিন ২৫ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার।
বিসর্জনের সময় অনেক জায়গায় শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ভক্তরা গান, বাদ্যযন্ত্র ও ধর্মীয় স্লোগানের মধ্য দিয়ে প্রতিমাকে নির্দিষ্ট জলাশয়ের দিকে নিয়ে যান। তবে পরিবেশের বিষয়টিও বর্তমানে উৎসব আয়োজনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত হয়েছে। প্রতিমা ও পূজার উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার এবং জলাশয়ের ক্ষতি না করার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে।
ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সম্প্রীতির বার্তা
গণেশ চতুর্থীর অন্যতম আকর্ষণ এর উৎসবমুখর পরিবেশ। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে এটি স্থানীয় সংস্কৃতি, শিল্প ও সামাজিক যোগাযোগের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। প্রতিমা নির্মাণ, আলোকসজ্জা, মণ্ডপসজ্জা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পী ও কারিগরদেরও সম্পৃক্ততা তৈরি হয়।
বাংলাদেশেও হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে পূজার আয়োজন হয়ে থাকে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি এসব আয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে গণেশ চতুর্থী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে ভক্তি, বিশ্বাস ও শুভ প্রত্যাশার একটি বিশেষ দিন। গণেশের আরাধনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা যেমন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জন্য প্রার্থনা করেন, তেমনি জীবনের বাধা পেরিয়ে শান্তি, সাফল্য ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশাও করেন। নতুন দিনের আশাবাদ এবং শুভ সূচনার এই বার্তাই উৎসবটির ধর্মীয় তাৎপর্যকে আরও গভীর করে তোলে।



















