শুভ জন্মাষ্টমী

shohrab russel

প্রকাশ :সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬

জন্মাষ্টমী

নাবিলা কবির

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ও পবিত্র ধর্মীয় উৎসব। ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রোহিণী নক্ষত্রের শুভক্ষণে বিষ্ণুর অষ্টম অবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব ঘটেছিল। দ্বাপর যুগে মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের কারাগারের অন্ধকারে মা দেবকী ও পিতা বসুদেবের কোল আলো করে মর্ত্যে অবতীর্ণ হন তিনি। অন্যায়, অধর্ম ও নিপীড়নের অবসান ঘটিয়ে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার যে বাণী তিনি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় দিয়েছিলেন, তা আজও কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে গভীর আলোড়ন জাগায়।
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পটভূমি
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, দ্বাপর যুগে পৃথিবী যখন পাপাচার ও অরাজকতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল, তখন ধর্মের পুনর্জাগরণের জন্য শ্রীকৃষ্ণের আগমন ঘটে। তিনি গীতায় অর্জুনকে বলেছিলেন—“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত...” অর্থাৎ যখনই ধর্মের অবক্ষয় ঘটে এবং অধর্মের প্রাদুর্ভাব হয়, তখনই ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি নিজেকে সৃষ্টি করি। শ্রীকৃষ্ণের জীবনদর্শন শুধু ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নিষ্কাম কর্ম, প্রেম, অহিংসা এবং সামাজিক সাম্যের প্রতীক হিসেবেও তিনি বন্দিত।
উৎসবের আয়োজন ও আচার-অনুষ্ঠান
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে প্রতিটি মন্দির ও ঘরে ঘরে নেওয়া হয় বিশেষ প্রস্তুতি। দিনভর উপবাস থেকে মধ্যরাতে—শ্রীকৃষ্ণের জন্মলগ্নে—বিশেষ পূজা-অর্চনার আয়োজন করা হয়। পঞ্চামৃত দিয়ে লাড্ডুগোপাল বা বাল্যরূপ শ্রীকৃষ্ণকে স্নান করানো হয়, সুন্দর পোশাকে সাজিয়ে ঝুলনায় দোলানো হয় এবং ভোগ নিবেদন করা হয়। ভোগে থাকে মাখন, নাড়ু, তাল ও ক্ষীরের তৈরি বিভিন্ন মিষ্টান্ন। ভজন, কীর্তন আর গীতা পাঠে মুখরিত থাকে পুরো রাত্রি। পরদিন অনুষ্ঠিত হয় 'নন্দোৎসব', যেখানে আনন্দের সাথে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। ভারত, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও মিছিল বের হয়। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে এ উপলক্ষে আয়োজিত ‘দহি হান্ডি’ বা মাখনের হাঁড়ি ভাঙার খেলা অত্যন্ত জনপ্রিয়।
ভক্তদের অনুভূতি ও ভাবনা
উৎসবের এই আনন্দ ও আধ্যাত্মিক ভাব ভক্তদের জীবনকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়। পুরান ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে আসা সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্ত রতন চক্রবর্তী (৫৫) বলেন:

"জন্মাষ্টমী আমাদের কাছে কেবল একটি ধর্মীয় তিথি নয়, এটি অন্তরের শুদ্ধতা ফিরিয়ে আনার এক সুযোগ। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি কৃষ্ণ জন্মে ঘরে ঘরে মাখনের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যে ন্যায়ের পথ দেখিয়ে গেছেন, আজকের এই অস্থির পৃথিবীতে তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।"

অন্যদিকে, তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী প্রিয়াঙ্কা সাহা (২২) উৎসবের সামাজিক দিক তুলে ধরে বলেন:

"আমাদের পরিবারে জন্মাষ্টমী মানেই মিলনমেলা। ভোর থেকেই সবাই মিলে মন্দির সাজানো, আলপনা দেওয়া আর মধ্যরাতের আরতির জন্য অপেক্ষা করা—এর মধ্যে যে আনন্দ ও আধ্যাত্মিক শান্তি আছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। গীতার নিষ্কাম কর্মের দর্শন আমাকে প্রতিনিয়ত নিজের পড়াশোনা ও কাজে অনুপ্রাণিত করে।"

পেশায় গৃহিণী মালতী দেবী (৪৫) বাল্যকৃষ্ণের সেবাকে মাতৃত্বের প্রতীক মনে করে বলেন:

"প্রতি বছর জন্মাষ্টমীর দিন আমি লাড্ডুগোপালকে নিজের সন্তানের মতোই সাজাই। সারা দিন উপবাস রাখার পর রাতে ভোগ দিয়ে যখন কৃষ্ণনাম করি, মনের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। ভগবানের কৃপায় প্রতিটি পরিবারের সন্তান যেন সুস্থ ও নিরাপদ থাকে, এটাই আমার কৃষ্ণের চরণে প্রার্থনা।"

সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা
শ্রীকৃষ্ণের প্রদর্শিত জীবনদর্শন সার্বজনীন। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে কর্তব্যে অটল থাকতে হয় এবং ফল লাভের আশা না করে নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করতে হয়। জাতি, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের বিভেদ ভুলে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই জন্মাষ্টমী উৎসবের মূল সুর। মন্দের বিরুদ্ধে ভালোর জয় এবং শোষণের বিরুদ্ধে সত্যের চিরন্তন লড়াইয়ের প্রেরণা হিসেবে জন্মাষ্টমী প্রতিটি মানুষের মনে আশার আলো প্রজ্বলিত করে।

আরো পড়ুন...

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন প্রধানমন্ত্রী