বাংলাদেশে প্রথম চাকরির বয়স: তারুণ্যের প্রত্যাশা ও কর্মজীবনের বাস্তবতা

shohrab russel

প্রকাশ :আগস্ট ২৫, ২০২৬

বাংলাদেশে প্রথম চাকরির বয়স: তারুণ্যের প্রত্যাশা ও কর্মজীবনের বাস্তবতা

নাবিলা কবির: বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে নিজের প্রথম উপার্জনের মুখ দেখতে বাংলাদেশের একজন তরুণের বয়স সাধারণত ২৪ থেকে ২৭ বছর ছুঁয়ে যায়।

তবে এই বয়সটা সবার জন্য এক রকম থাকে না।

প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার ধরন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট,

দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত ইন্টার্নশিপ কিংবা সরকারি চাকরির দীর্ঘ নিয়োগ প্রক্রিয়া সব মিলিয়ে প্রথম কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময়টাতে বেশ বড় ফারাক তৈরি হয়।

ইঞ্জিনিয়ারিং বা আইটির মতো টেকনিক্যাল বিষয়ের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক দ্রুত কাজ শুরু করতে পারলেও চিকিৎসাসেবা

কিংবা সরকারি খাতের প্রার্থীদের অনেক বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়।

জরিপের চোখে প্রথম চাকরির চিত্র

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং যুব কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী,

দেশের শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশই অনার্স শেষ করে প্রথম নিয়মিত চাকরির সুযোগ পেতে পেতে ২৫ পেরিয়ে যান।

* আইটি ও ইঞ্জিনিয়ারিং (গড় বয়স ২৩–২৫ বছর): চার বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ডিগ্রি শেষ হওয়া

এবং টেক সেক্টরে ব্যবহারিক দক্ষতার ভিত্তিতে দ্রুত নিয়োগ পাওয়ার কারণে এই খাতের তরুণরা বেশ আগেই কাজ শুরু করতে পারেন।

* মেডিকেল ও স্বাস্থ্যসেবা (গড় বয়স ২৫–২৭ বছর): পাঁচ বছরের এমবিবিএস শেষ করে বাধ্যতামূলক এক বছরের ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হয়।

মাঝখানে এটি দুই বছর করার প্রস্তাব এলেও তীব্র প্রতিবাদের মুখে তা বাতিল হয়।

ফলে সব মিলিয়ে পেশাদার চিকিৎসক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করতে বয়স ২৫ পেরিয়ে যায়।

* ব্যাংকিং ও করপোরেট (গড় বয়স ২৫–২৭ বছর): অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করার পর একাধিক ধাপের বাছাই ও নিয়োগ পরীক্ষা শেষ করতে করতে বেশ সময় লেগে যায়।

* সরকারি চাকরি ও বিসিএস (গড় বয়স ২৬–২৮+ বছর): প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভা পেরিয়ে দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে কয়েক বছর লেগে যাওয়ায় এই খাতে প্রবেশের বয়স সবচেয়ে বেশি।

তরুণদের নিজস্ব বয়ান: বাস্তবতা যা বলছে

পড়াশোনা শেষে কীভাবে কর্মজীবনের শুরুটা হলো, তা নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বিভিন্ন পেশার কয়েকজন তরুণ...

আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে ২৫ বছর বয়সেই চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেছেন ডা. মারিয়া রহমান।

তিনি বলেন, "মেডিকেল পড়াশোনায় সময় বেশি লাগে। তবে শৃঙ্খলাবদ্ধ রুটিন এবং ইন্টার্নশিপ শেষেই সুযোগ থাকায় ২৫ বছর বয়সেই ক্যারিয়ার শুরু করতে পেরেছি।"

অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় AIUB থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে ২৪ বছর বয়সেই চাকরিতে যোগ দেওয়া মো. দ্বীহান রহমানের অভিজ্ঞতা ভিন্ন।

তাঁর মতে, "ইঞ্জিনিয়ারিং বা আইটি সেক্টরে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতাই আসল। ভার্সিটির শেষ বর্ষে প্রজেক্ট ও ইন্টার্নশিপে মনোযোগ দিলে গ্র্যাজুয়েশনের পরপরই চাকরিতে প্রবেশ করা সহজ হয়।"

পাবলিক মেডিকেলের দীর্ঘ সময় নিয়ে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডা. নীহারিকা জাহান, ২৬ বছর বয়সে প্রথম চাকরিতে আসা,

যেকোনো মেডিকেল কলেজে দীর্ঘ একাডেমিক প্রক্রিয়া ও পেশাগত পরীক্ষা শেষ করে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে করতেই তো ২৬ বছর হয়ে যায়।

একই অভিজ্ঞতা ব্যাংকিং খাতে ক্যারিয়ার শুরু করা গালিব রহমান নিলয়েরও।

২৬ বছর বয়সে ব্যাংকার হিসেবে যোগ দেওয়া নিলয় জানান, "সাধারণত অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করতেই ২৪-২৫ বছর কেটে যায়।

এরপর একাধিক লিখিত পরীক্ষা ও মৌখিক ভাইভা পার হতে প্রায় এক বছর সময় লাগে, ফলে প্রথম চাকরি পেতে ২৬ বছর হয়ে যাওয়া বেশ স্বাভাবিক।"

কেন এই সময়ের ব্যবধান?

পড়াশোনা আর প্রথম চাকরির বয়সের এই ফারাকের পেছনে মূলত কাজ করে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গতি ও বিষয়ের ভিন্নতা।

অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চার বছরে নিয়ম মেনে সেমিস্টার শেষ করতে পারলেও কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের কারণে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করতেই এক-দুই বছর বাড়তি নষ্ট হয়।

পাশাপাশি, সাধারণ ডিগ্রিধারীদের যেখানে সরকারি বা করপোরেট চাকরির জন্য দীর্ঘ সময় ধরে লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হয়, সেখানে কোডিং

বা ডিজাইনের মতো ব্যবহারিক স্কিল জানা থাকলে শিক্ষার্থীরা পড়ার ফাঁকেই বা ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্টের মাধ্যমে দ্রুত ঢুকে যেতে পারছেন।

তরুণদের কর্মক্ষম বয়সের এই অপচয় কমাতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই কাজের বাজারের উপযোগী ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়ানো

এবং সরকারি-বেসরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলোকে আরও দ্রুত ও আধুনিক করা প্রয়োজন।

এতে উচ্চশিক্ষা শেষ করে বেকার বসে থাকার অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমে আসবে।

আরো পড়ুন...

ঢাকায় আয় বাড়ছে না, খরচ থামছে না