ঢাকায় আয় বাড়ছে না, খরচ থামছে না

shohrab russel

প্রকাশ :আগস্ট ২৪, ২০২৬

ঢাকায় আয় বাড়ছে না, খরচ থামছে না

অতিন বিশ্বাস: ঢাকায় মাসের শুরুতে বেতন আসে।

কিন্তু মাসের শেষটা যেন অনেক চাকরিজীবীর কাছে আরেক বাস্তবতার নাম ধার, কিস্তি কিংবা গ্রামের বাড়ি থেকে টাকা এনে সংসার চালানো।

নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ ও

অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপে অনেক পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যে আয় করছেন, তা দিয়ে মাস পার করাই কঠিন হয়ে পড়ছে।

রাজধানীতে একটি পরিবারের মোটামুটি স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য কত আয় প্রয়োজন আর সেই আয় কি

একজন চাকরিজীবী বাস্তবে করতে পারছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা হয়েছে ঢাকায় বসবাসকারী তিনজন ভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে।

তাঁদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে একই ধরনের সংকট আয় আছে, কিন্তু প্রয়োজনের সঙ্গে তার ব্যবধান ক্রমেই বড় হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক একটি মানদণ্ডও বিষয়টির গুরুত্ব বোঝায়। Global Living Wage Coalition-এর ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী,

ঢাকায় চার সদস্যের একটি পরিবারের ‘basic but decent living’ নিশ্চিত করতে মাসে আনুমানিক ৪৮ হাজার ২২ টাকা প্রয়োজন।

একই গবেষণায় living wage হিসেবে মাসিক ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকার হিসাব দেওয়া হয়েছে।

এই হিসাব Anker Methodology অনুসরণ করে করা, যেখানে খাবার, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া হয়।

তবে বাস্তব জীবনের গল্প অনেক সময় কোনো benchmark-এর চেয়েও বেশি কঠিন।

‘২০-২১ দিন কোনোভাবে চলে, এরপর ধার করতে হয়’

ঢাকার একটি সুপারমার্টে কাজ করেন তূর্য দাস।

স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর একটি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য, বাসাভাড়া, বাজার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও অন্যান্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে মাসের শেষদিকে আর হাতে টাকা থাকে না।

তূর্য বলেন, তাঁদের বাসাভাড়া একসময় ৬ হাজার টাকা থাকলেও জানুয়ারিতে তা বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার টাকা।

একই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ছে।

চাল, ভোজ্যতেল ও সবজি কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। দুধ, ডিম ও ওষুধের খরচের কথা আলাদা করে বলার মতো অবস্থাও নেই।

তাঁর ভাষায়, যে বেতন তিনি পান, তা দিয়ে মাসের ২০ থেকে ২১ দিন কোনোভাবে চলে যায়।

এরপরের দিনগুলো চালাতে তাঁকে ধারদেনা করতে হয়, কখনো গ্রামের বাড়ি থেকেও টাকা আনতে হয়। পরের মাসে বেতন পাওয়ার পর সেই টাকার একটি অংশ আবার আগের ধার শোধ করতেই চলে যায়।

অর্থাৎ তাঁর সমস্যা শুধু মাসিক খরচ বেশি হওয়া নয়। মূল সংকট হলো বর্তমান আয় দিয়ে প্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার পুরো সময়টুকু টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না।

তূর্যের অভিজ্ঞতায় ঢাকায় থাকা মানে শুধু বাসাভাড়া দেওয়া নয়; প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে ভবিষ্যৎ মাসের আয়ও আগাম খরচ হয়ে যাচ্ছে।

একমাত্র উপার্জনকারী আসিফ, কিস্তির টাকায় চলছে সংসার

২০০৮ সাল থেকে পরিবার নিয়ে ঢাকায় বসবাস করছেন চা ব্যবসায়ী আসিফ আলী। তাঁর পরিবারে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও বাবা রয়েছেন।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী তিনি।

সন্তানদের পড়াশোনা, স্কুলের ফি, প্রাইভেট শিক্ষক, খাবার ও অন্যান্য পারিবারিক ব্যয় মেটাতে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মধ্যে রয়েছেন তিনি।

আসিফের ব্যবসার খরচও বেড়েছে।

তাঁর ভাষ্য, চলতি বছরে দুই দফায় এলপি গ্যাসের দাম বেড়েছে।

চিনি, চা-পাতা ও দুধের মতো চায়ের দোকানের মৌলিক উপকরণের দামও বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে চায়ের দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।

এর সঙ্গে রয়েছে বিদ্যুৎ বিলের চাপ। দোকানে দুটি ফ্যান ও কয়েকটি লাইট থাকলেও গত মাসে তাঁর বিদ্যুৎ বিল এসেছে প্রায় আড়াই হাজার টাকা।

সিগারেটের ওপর শুল্ক পরিবর্তনের কারণে ব্যবসার লাভের পরিমাণও কমেছে বলে জানান তিনি।

অর্থাৎ ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু আয় সেই হারে বাড়ছে না।

এর প্রভাব পড়েছে পরিবারেও। সংসারের ব্যয় মেটাতে তাঁর স্ত্রীকে তিনটি এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে।

প্রতি মাসের শুরুতে আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় কিস্তি পরিশোধে। বাকি টাকা দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা, বাজার, বিদ্যুৎ বিল, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ সামলাতে হচ্ছে।

আসিফের কথায়, আগে যেসব পণ্য তুলনামূলক সহজে কেনা যেত, এখন সেগুলোর দামও সংসারে বড় চাপ তৈরি করছে।

পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে পরিবারের খাবারের পেছনেই আয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে।

পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথাও ভাবছেন তিনি।

তাঁর যুক্তি, ঢাকায় থেকে যদি আয় দিয়ে সংসার চালানোই সম্ভব না হয়, তাহলে বাড়িতে ফিরে অন্তত কম খরচে জীবন চালানো সম্ভব।

সরকারি ব্যাংকের কর্মচারী মামুনেরও স্বস্তি নেই

চিত্রটি শুধু বেসরকারি চাকরি বা ছোট ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

সরকারি একটি ব্যাংকের অফিস সহকারী মামুন সাহেবের অভিজ্ঞতাতেও রয়েছে একই ধরনের চাপ।

মাসের শুরুতেই বাসাভাড়া, গ্যাস, ওয়াইফাই, ময়লা পরিষ্কারসহ বিভিন্ন নির্দিষ্ট বিল মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায় বলে জানান তিনি।

এরপর রয়েছে সন্তানের পড়াশোনা, নিজের যাতায়াত এবং পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন।

তাঁর ভাষায়, বর্তমান নিত্যপণ্যের বাজারদর তাঁকে রীতিমতো হিমশিম খাওয়াচ্ছে। আয় নির্দিষ্ট, কিন্তু প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জায়গাগুলো একের পর এক বাড়ছে।

মামুনের ক্ষেত্রে তাই প্রশ্নটি শুধু ‘মাসে কত টাকা খরচ হয়’ এমন নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, একজন নিয়মিত চাকরিজীবীর আয় কি তাঁর পরিবারকে একটি স্থিতিশীল জীবন দিতে পারছে?

তিনজনের গল্প, একই সংকেত

তূর্য দাস, আসিফ আলী ও মামুন তিনজনের পেশা আলাদা। তাঁদের পারিবারিক পরিস্থিতিও এক নয়।

একজন সুপারমার্টের কর্মচারী, একজন ছোট ব্যবসায়ী, অন্যজন সরকারি ব্যাংকের কর্মচারী।

কিন্তু তাঁদের বক্তব্যে একটি জায়গায় স্পষ্ট মিল রয়েছে আয় ও প্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।

কারও ক্ষেত্রে সেই ব্যবধান পূরণ হচ্ছে গ্রামের বাড়ি থেকে টাকা এনে। কারও ক্ষেত্রে এনজিও ঋণ নিয়ে।

আবার কেউ নির্দিষ্ট বেতনের মধ্যেই বাসাভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন খরচ সামলাতে গিয়ে সঞ্চয়ের সুযোগ হারাচ্ছেন।

এই ব্যবধান দীর্ঘ হলে তার প্রভাব শুধু একটি পরিবারের মাসিক বাজেটে সীমাবদ্ধ থাকে না।

ঋণের কিস্তি বাড়ে, সঞ্চয় কমে, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয় এবং পরিবারকে প্রয়োজনীয় কিছু ব্যয় কমিয়ে দিতে হয়।

বিশেষ করে একমাত্র উপার্জনকারীর পরিবারে এই চাপ আরও বেশি।

একজন মানুষের আয়ের ওপর যখন স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মায়ের মতো একাধিক সদস্যের প্রয়োজন নির্ভর করে, তখন আয়ের সামান্য ঘাটতিও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

ঢাকা দেশের প্রধান কর্মসংস্থান, ব্যবসা, শিক্ষা ও চিকিৎসাকেন্দ্র। তাই কাজের সন্ধানে মানুষকে রাজধানীতে আসতেই হয়।

কিন্তু যদি একজন কর্মীর আয় তাঁর পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর্যায়েও না পৌঁছায়,

তাহলে রাজধানীতে বসবাসের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আসিফ আলীর মতো কেউ যখন পরিবার নিয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবেন, তখন সেটি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়;

এটি শহর ও গ্রামের জীবনযাত্রার ব্যয়ের পার্থক্য নিয়েও একটি প্রশ্ন তৈরি করে।

আর তূর্য দাসের মতো একজন কর্মী যখন মাসের শেষ সপ্তাহ চালাতে গ্রামের বাড়ির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন, তখন বোঝা যায় চাকরি থাকা এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল থাকা এক বিষয় নয়।

মামুনের অভিজ্ঞতা আবার দেখায়, নিয়মিত চাকরি থাকলেও নির্দিষ্ট আয় যদি বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে,

তাহলে মধ্যম আয়ের পরিবারও আর্থিক চাপের বাইরে থাকে না।

সমস্যাটি আরও গভীর—আয় ও জীবনযাপনের প্রয়োজনের মধ্যে ব্যবধান কতটা বড় হয়ে গেছে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

ঢাকার চাকরিজীবী ও স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর বাস্তবতা তাই নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।

রাজধানীতে একটি পরিবারকে স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন দিতে একজন উপার্জনকারীর কত আয় প্রয়োজন

এবং দেশের বর্তমান কর্মসংস্থান ও মজুরি কাঠামো সেই প্রয়োজনের কতটা পূরণ করতে পারছে

এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো ঢাকার জীবনযাত্রার প্রকৃত সংকটকে সবচেয়ে স্পষ্ট করে তুলবে।

আরো পড়ুন.....

হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ৭ জনের মৃত্যু