নাবিলা কবির: গাছ ছাড়াই হবে কাগজ, বিজ্ঞানীদের নতুন 'মুনশট' উদ্যোগ।
মরুভূমির এক বুনো উদ্ভিদের হাত ধরে নতুন বিপ্লব জলবায়ু পরিবর্তন
এবং দ্রুত বন উজাড়ের এই সংকটময় সময়ে কাগজ শিল্পের জন্য গাছ কাটার ওপর নির্ভরতা কমানো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
ঠিক এই সময়ে একটি উদ্ভাবনী কোম্পানি কাগজের মণ্ড বা পাল্প তৈরিতে কাঠের বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে এক বিশেষ প্রজাতির মরুভূমির উদ্ভিদকে।
বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় যাকে ‘মুনশট’ বা দুঃসাহসিক কিন্তু যুগান্তকারী প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কাগজ ও প্যাকেজিং পণ্যের মূল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে কাঠের আঁশ বা ফাইবার।
তবে বিশাল বনাঞ্চল ধ্বংসের পেছনে কাগজ শিল্পের হাত বহু অংশে দায়ী।
উক্ত সমস্যা সমাধানে গবেষকেরা এবার দৃষ্টি ফিরিয়েছেন বিশ্বের রুক্ষ ও
শুষ্ক মরু অঞ্চলের দিকে যেখানে বেড়ে ওঠে ‘গুয়াউলে’ (Guayule) বা অনুরূপ শক্তিবান বুনো ঘাস ও গুল্মজাতীয় মরু উদ্ভিদ।
মরু উদ্ভিদের চমকপ্রদ সম্ভাবনা
মরুভূমির এই উদ্ভিদগুলো বেঁচে থাকার জন্য অতিরিক্ত পানি বা উর্বর মাটির ওপর নির্ভরশীল নয়।
যে অনুর্বর জমিতে খাদ্যশস্য চাষ সম্ভব নয়, সেখানেও এগুলো খুব সহজে জন্মায়।
গবেষকদের মতে, এই উদ্ভিদের ডালে প্রচুর পরিমাণে শক্তিশালী প্রাকৃতিক সেলুলোজ ফাইবার বা আঁশ থাকে,
যা উচ্চমানের কাগজ এবং টেকসই প্যাকেজিং পণ্য তৈরির জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত।
যেখানে একটি গাছ কাটার উপযোগী হতে দশকের পর দশক সময় লাগে, সেখানে এই মরু উদ্ভিদগুলো মাত্র কয়েক মাস থেকে এক-দুই বছরের মধ্যে ফলন দেয় এবং একাধিকবার কাটা যায়।
পরিবেশগত বিশাল সুবিধা
এই বিকল্পের সবচেয়ে বড় দিক হলো এর পরিবেশবান্ধব চরিত্র:
বনাঞ্চল রক্ষা: কাঠের নির্ভরতা কমে গেলে প্রাকৃতিক অরণ্য এবং তার জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।
পানির সাশ্রয়: ঐতিহ্যবাহী কাঠ প্রক্রিয়াকরণ ও চাষের তুলনায় মরু উদ্ভিদে পানির ব্যবহার প্রায় ৮০-৯০% কম।
কার্বন পদচিহ্ন হ্রাস: খাদ্য উৎপাদনের জমিতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটিয়ে পতিত মরুভূমিতে এই উদ্ভিদ চাষ করে বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত কার্বনও আটকে রাখা সম্ভব।
চ্যালেঞ্জ ও ‘মুনশট’ লক্ষ্য
উদ্যোগটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও এটিকে ‘মুনশট’ বলা হচ্ছে এর প্রয়োগিক জটিলতার কারণে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা কাগজের কলগুলো মূলত কাঠের আঁশ প্রক্রিয়াজাত করার উপযোগী করে তৈরি।
মরু উদ্ভিদের ফাইবারকে সেই প্রচলিত কাঠামোর সাথে মানানসই করা এবং বাণিজ্যিকভাবে বিশাল পরিসরে সাশ্রয়ী মূল্যে উৎপাদন করা একটি বড় কারিগরি পরীক্ষা।
তবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিটির দাবি, আধুনিক বায়ো-টেকনোলজি এবং পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছে,
যা সাধারণ কাগজ, কার্ডবোর্ড ও প্যাকেজিং উপাদানের চেয়ে কোনো অংশে কম টেকসই নয়।
একটি টেকসই ভবিষ্যতের পথ
দৈনন্দিন জীবনে ই-কমার্সের বিস্তার এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার ফলে কাগজভিত্তিক প্যাকেজিংয়ের চাহিদা বিশ্বজুড়ে আকাশচুম্বী।
কিন্তু প্যাকেজিং করতে গিয়ে যদি আরও বেশি বন ধ্বংস হয়, তবে তা টেকসই সমাধান হতে পারে না।
এই পরিস্থিতিতে মরু উদ্ভিদের আঁশ কাগজের বাজারে এনে দিতে পারে এক নতুন দিগন্ত।
প্রকৃতির সবচেয়ে অবহেলিত ও রুক্ষ কোণে বেড়ে ওঠা একটি সাধারণ গাছ কীভাবে আধুনিক বিশ্বের প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত সংকট মেটাতে পারে এই উদ্ভাবন তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
যদি এই ‘মুনশট’ পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয়, তবে আগামী দিনের কাগজ শিল্পের গল্প লেখা হবে সবুজ বনাঞ্চল ধ্বংস করে নয়,
বরং মরুভূমির বুকে টেকসই প্রাণের ছোঁয়ায়।
-প্রেসপয়েন্টবিডি/প্রযুক্তি













