রাজনৈতিক সংঘাতে ৯ মাসে ৭৩ মৃত্যু, বিএনপির ৪৬

Ahmed Siam

প্রকাশ :অক্টোবর ২০, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজনৈতিক বিরোধ ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাতে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশে ৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ১ হাজার ১৩টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬ হাজার ৪৭৩ জন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৪৬ জন, জামায়াতের আটজন এবং আওয়ামী লীগের ছয়জন রয়েছেন। বাকি ১২ জনের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি অথবা তাঁরা অন্য দলের সদস্য।

মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। এতে ১৬টি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ, সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

এইচআরএসএসের পর্যবেক্ষণে, রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১ শতাংশের সঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল অথবা বিএনপি ও অন্য রাজনৈতিক দলের বিরোধের সম্পর্ক রয়েছে। দলটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ৩৪২টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬৩২ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৩২১টি ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন ২ হাজার ১৯০ জন।

নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার চিত্রও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে ৪০২টি ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬২৩ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ছয় শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যাও উদ্বেগজনক। গত নয় মাসে এ ধরনের ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে কারাগারে ৯৫ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতির অবনতি দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। নয় মাসে ২ হাজার ৪০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬৫৭ জন ধর্ষণের শিকার এবং ২৯ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে ১ হাজার ৮১০ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে অন্তত ৪৯৪ জন মারা গেছে। শ্রমিক নির্যাতনের ৫৮২টি ঘটনায় ১৪৫ জন নিহত ও ১ হাজার ২৬৩ জন আহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রীর অভাবে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৯০ শ্রমিক। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলায় আহত হয়েছেন ৬২ জন। হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হয়েছে ২১টি মন্দির, ২০টি প্রতিমা ও ৪৭টি বসতবাড়ি।

সীমান্তে বিএসএফের হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩৯ জন আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে হত্যাকাণ্ডের ৪৬৫টি ঘটনায় নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে ৪৯১টি লাশ উদ্ধারের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্তত একটি গুম এবং একজনকে জোর করে তুলে নেওয়ার অভিযোগও নথিভুক্ত হয়েছে।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ২৮৮টি ঘটনায় ২৯৭ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৮৭ জন সাংবাদিক লাঞ্ছিত, ৭৭ জন হুমকির শিকার এবং ২০ জন আটক হয়েছেন। সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়ার ৫৮টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪৩৯ জন, আটক হয়েছেন ৪৬ জন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২৭০টির বেশি মামলায় ৫ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেছেন, মানবাধিকার সুরক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, গণপিটুনি, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা এবং হেফাজত ও কারাগারে মৃত্যু ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

Google News-এ Press Point BD-এর খবর দেখুন আমাদের সর্বশেষ সংবাদ ও প্রতিবেদন Google News-এ পড়ুন।