অতিন বিশ্বাস: বাংলাদেশে মাদক চোরাচালানের পেছনে সীমান্তের ওপারে সক্রিয় একটি চক্র কাজ করছে এবং নতুন কৌশল হিসেবে ড্রোন ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদক পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তাঁর ভাষ্য, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশে মাদক ঢোকানো হচ্ছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) খুলনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে প্রশাসনের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, সীমান্তের ওপারে অবস্থানকারী ইয়াবা চোরাকারবারিরা মাদক পাচারের পরিকল্পনা করছে। তাঁর দাবি, শুধু প্রচলিত স্থলপথ বা অন্যান্য পরিচিত রুট নয়, ড্রোনের মাধ্যমেও দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি পাচারের নতুন পদ্ধতিগুলো নিয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে।
শুধু খুলনা নয়, সারা দেশের জন্য উদ্বেগ
আইনমন্ত্রী বলেন, মাদকের সমস্যা এখন কোনো একটি জেলা বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে মাদক শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধে ডোপ টেস্টের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
মাদকের বিস্তার ঠেকাতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয় বলেও ইঙ্গিত দেন মন্ত্রী। বিশেষ করে তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে শিক্ষা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক প্রতিরোধে সরবরাহের পাশাপাশি চাহিদা কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের জন্য স্বাস্থ্যকর বিনোদন, খেলাধুলা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা গেলে মাদকাসক্তির ঝুঁকি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে সীমান্তে নজরদারি এবং দেশের ভেতরে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাও প্রয়োজন।
সীমান্তপথে মাদক পাচারের পুরোনো বাস্তবতা
বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বিএসএস)। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮ লাখ ৭২ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় সীমান্তকেন্দ্রিক পাচার নেটওয়ার্কের উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর আগে বিভিন্ন সরকারি বক্তব্য ও প্রতিবেদনে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের মাদক বাংলাদেশে প্রবেশের কথা উঠে এসেছে। তবে কোন মাদক কোন পথে এবং কী পরিমাণে প্রবেশ করছে, তা সময় ও অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।
ড্রোন ব্যবহারের দাবি কতটা নতুন?
মাদক পাচারে ড্রোন ব্যবহারের বিষয়ে আইনমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যটি পাচারকারীদের কৌশল পরিবর্তনের একটি গুরুতর ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তাঁর বক্তব্যের বাইরে এ মুহূর্তে ড্রোন ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কোনো মাদক চালান বাংলাদেশে ঢোকার ঘটনা, উদ্ধার বা গ্রেপ্তারের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
তাই ড্রোনের মাধ্যমে ইয়াবা, ফেনসিডিল বা অন্যান্য মাদক নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও প্রমাণের অপেক্ষা করা প্রয়োজন। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যকে এ মুহূর্তে একটি সরকারি অভিযোগ বা দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সন্ত্রাস দমনেও মানবাধিকারের কথা
মতবিনিময় সভায় সন্ত্রাস দমন নিয়েও বক্তব্য দেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সন্ত্রাস মোকাবিলায় সরকার ‘ক্রসফায়ার’-এর পথে যাবে না। মানবাধিকার রক্ষা করে প্রয়োজন হলে প্রচলিত আইন আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে সন্ত্রাস দমনের কথা জানান তিনি।
মাদক ও সন্ত্রাস দুই ক্ষেত্রেই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন মন্ত্রী।
বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে এখন তাই একদিকে সীমান্তে নজরদারি ও চোরাচালান নেটওয়ার্ক ভাঙা, অন্যদিকে তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখার সামাজিক উদ্যোগ দুই দিকেই সমান গুরুত্ব প্রয়োজন। আইনমন্ত্রীর ড্রোনে মাদক প্রবেশের দাবির পর সীমান্ত নিরাপত্তা ও মাদক চোরাচালানের নতুন কৌশল নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়ে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।













