মামুন রসিদ, কক্সবাজার প্রতিনিধি: বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল সামুদ্রিক সম্পদকে শিক্ষা, গবেষণা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে কক্সবাজারে একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রস্তাবিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইউনিভার্সিটি অব ব্লু ইকোনমি সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি’ (UBEST)। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্র জানায়, কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে একটি আধা-সরকারি পত্র দেন। চিঠিতে বাংলাদেশের সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলের সম্ভাবনাময় সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের জন্য বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য হবে সমুদ্র ও উপকূলকে কেন্দ্র করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। বিশেষ করে সমুদ্রবিজ্ঞান, মৎস্য ও অ্যাকুয়াকালচার, সামুদ্রিক পরিবেশ, উপকূলীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি পর্যটন ও হসপিটালিটি ব্যবস্থাপনার মতো উপকূলীয় অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ও শিক্ষার আওতায় আসতে পারে।
বাংলাদেশের রয়েছে বিশাল সমুদ্রসীমা এবং দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল। এই সামুদ্রিক এলাকার জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ, খনিজসম্পদ, সামুদ্রিক পরিবেশ ও অন্যান্য সম্পদকে টেকসইভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু সম্পদের উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আধুনিক গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষ গবেষক এবং বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ।
এই জায়গায় কক্সবাজারে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় এখানকার শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সামুদ্রিক পরিবেশ ও উপকূলীয় সম্পদ নিয়ে গবেষণার সুযোগ পেতে পারেন। ফলে তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শুরুতেই বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগানোর প্রস্তাবও রয়েছে। চিঠিতে কক্সবাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই)-এর অবকাঠামো, গবেষণাগার, বৈজ্ঞানিক জনবল ও গবেষণা সুবিধা ব্যবহার করে প্রাথমিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রম শুরু করার কথা বলা হয়েছে। এতে সময় ও ব্যয় দুটোই কমানো সম্ভব হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একাডেমিক ভবন, গবেষণাগার, আবাসিক সুবিধা এবং অন্যান্য অবকাঠামো ধাপে ধাপে গড়ে তোলার সুযোগ থাকবে। এতে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরির পথ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সমুদ্রের সম্পদ আহরণের পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। অতিরিক্ত আহরণ, দূষণ কিংবা অপরিকল্পিত উন্নয়ন সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে। তাই প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় সম্পদ ব্যবহারের পাশাপাশি সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়টি বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার শুধু পর্যটননির্ভর অর্থনীতির জন্য নয়, সামুদ্রিক শিক্ষা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা সমুদ্রবিজ্ঞান ও নীল অর্থনীতিসংক্রান্ত বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে পারেন। একই সঙ্গে সামুদ্রিক গবেষণায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে প্রস্তাব থেকে বাস্তব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথে আইনগত অনুমোদন, একাডেমিক কাঠামো, অর্থায়ন, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনাসহ বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে উদ্যোগটি কীভাবে এবং কত দ্রুত বাস্তব রূপ পায়।
সামুদ্রিক সম্পদ ও উপকূলীয় অর্থনীতির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে কক্সবাজারে এমন একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও সমুদ্র গবেষণায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে জ্ঞান, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতা আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।













