নাবিলা কবির: একজন সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারের চোখে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র ঠিক কেমন?
সকাল আটটার হাসপাতালের বহির্বিভাগ (Outpatient Department)। দরজার ওপারে শত শত মানুষের কোলাহল, হাতে ৫ থেকে ১০ টাকার টিকিট, চোখে রাজ্যের ক্লান্তি আর চিকিৎসার তীব্র প্রত্যাশা।
একজন সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারের দিনটি শুরু হয় এই উপচে পড়া ভিড়ের চাপ আর সীমিত রসদের বাস্তবতা দিয়ে।
বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা একদিকে যেমন দেশের প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত কোটি মানুষের একমাত্র ভরসা,
অন্যদিকে কাঠামোগত দুর্বলতা, তীব্র জনবল সংকট ও অপ্রতুল বাজেটের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার তৃণমূল থেকে শুরু করে টারশিয়ারি পর্যায় পর্যন্ত কর্মরত চিকিৎসকদের চোখে এই ব্যবস্থার বাস্তব চিত্রটি ঠিক কেমন,
তা উঠে এসেছে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা ডাক্তারদের অভিজ্ঞতায়।
তৃণমূলের সংকট ও রেফারেল সিস্টেমের শূন্যতা
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসকদের প্রতিনিয়ত লড়তে হয় যন্ত্রপাতির অভাব ও অপরিকল্পিত রোগী ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে।
মীরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. তানজীম আহমেদ (BM&DC রেজি. নং: A-৭৮৪১২) বলেন, "সকালে ওপিডিতে একাই আড়াইশ থেকে তিনশ রোগী দেখতে হয়। প্রতি রোগীর জন্য গড়ে এক মিনিট সময়ও পাওয়া যায় না।
তিনি আরো বলেন, রক্তচাপ মাপা আর কথা শুনতেই সময় শেষ। সাধারণ গ্যাস্ট্রিক বা ডায়রিয়ার রোগী থেকে শুরু করে জটিল হৃদরোগী সবাই সরাসরি হাসপাতালে চলে আসেন।
একটি কার্যকর রেফারেল সিস্টেম না থাকায় প্রাথমিক পর্যায়ের রোগীরাই টারশিয়ারি বা জেলা হাসপাতালে গিয়ে ভিড় বাড়াচ্ছেন,
আর আমরা উপজেলায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও টেকনিশিয়ানের অভাবে সঠিক সময়ে পূর্ণাঙ্গ সেবা দিতে পারছি না। বলেও জানান ডা.তানজীম আহমেদ।

জেলা পর্যায়ের চাপ ও জরুরি সুবিধার সীমাবদ্ধতা
ঢাকা কুর্মিটলা জেলা সদর হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি ও অবস্) ডা. নুসরাত জাহান (BM&DC রেজি. নং: A-৬২১৫০) বলেন,
জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। গাইনি ও সার্জারি বিভাগে এই সংকট আরও প্রকট।
"১০০ শয্যার হাসপাতালে রোগী ভর্তি থাকে তিন শতাধিক। লেবার ওয়ার্ডের মেঝেতেও তিল ধারণের জায়গা থাকে না।
প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০টি জটিল সিজারিয়ান ও নরমাল ডেলিভারি করতে হয়।
অথচ পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ারের জন্য ডেডিকেটেড কোনো সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন বা আইসিইউ (ICU) ব্যাকআপ নেই।
রক্তক্ষরণজনিত জটিলতায় অনেক সময় রোগীকে ঢাকায় পাঠাতে হয়, আর রাস্তায় নষ্ট হওয়া অমূল্য সময়টুকু রোগীর জীবন ঝুঁকিতে ফেলে দেয় বলেও জানান তিনি।"
মেডিকেল কলেজের দমবন্ধ পরিবেশ ও চিকিৎসকদের মানসিক চাপ
টারশিয়ারি পর্যায়ের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে পৌঁছালে বোঝা যায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চূড়ান্ত রূপ।
এখানে রোগী প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, ফলে মেঝে, বারান্দা এমনকি সিঁড়ির গোড়াতেও শুয়ে থাকেন রোগীরা।
ঢাকা স্যার সলিমুল্লাহ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেজিস্ট্রার, ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগ, ডা. আরিফুল ইসলাম জানান,
"টানা ৩৬ ঘণ্টার ডিউটিতে যখন একজন ইন্টার্ন বা ইনডোর ডাক্তার পা রাখেন, তখন তিনি জানেন তিনি একা ৬০-৭০ জন মুমূর্ষু রোগীর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
অনেক সময় হাসপাতালে ওষুধ শেষ হয়ে যায়, সিটি স্ক্যান মেশিন নষ্ট থাকে।
বাইরের ফার্মেসি বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর রোগীর পরিবারের অতিরিক্ত খরচের ক্ষোভ এসে পড়ে ডিউটিরত তরুণ চিকিৎসকদের ওপর।
কর্মক্ষেত্রে ডাক্তারদের নিরাপত্তা নেই বললেই চলে, অথচ আমরা জীবন বাজি রেখেই প্রতিটি শিফট পার করি।"
নীতিগত ত্রুটি ও বাজেট স্বল্পতা
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, সমস্যাটি শুধু হাসপাতালের ভেতরকার নয়; এর মূল কারণ নীতিগত ও বাজেটীয় কাঠামোর দুর্বলতা।
অন্যদিকে, অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্য গবেষক ডা. কাজী মাহফুজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশেরও কম।
ফলে রোগীদের আউট-অব-পকেট এক্সপেন্ডিচার (Out-of-Pocket Expenditure) প্রায় ৭৩ শতাংশের বেশি, যা দরিদ্র মানুষকে চিকিৎসার খরচের চাপে আরও নিঃস্ব করে তোলে।
আমাদের চিকিৎসকদের মেধা ও নিষ্ঠার কোনো ঘাটতি নেই; ঘাটতি কেবল চিকিৎসা অবকাঠামোর সঠিক বণ্টন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত পদ ও পরিবেশ সৃষ্টিতে।"
বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা টিকে রয়েছে মূলত হাজারো তরুণ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের অমানুষিক পরিশ্রম এবং সীমাবদ্ধতাকে জয় করার মানসিকতার ওপর।
শূন্যস্থান পূরণ, রেফারেল ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া
এবং চিকিৎসকদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে এই ভঙ্গুর ব্যবস্থাপনাই দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম।













