জয়শ্রী রানী: গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকার সরকারি দাবি থাকলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকের হাতে প্রয়োজনের সময় সার না পৌঁছানো নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।
কোথাও নির্ধারিত দামে সার মিলছে না, কোথাও ডিলাররা চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহের কথা বলছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবৈধ মজুত, কালোবাজারি ও পাচারের অভিযোগ। ফলে জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও মাঠপর্যায়ে কেন সংকট তৈরি হচ্ছে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি হিসাবে, রবি ও বোরো মৌসুম সামনে রেখে দেশে ৩৫ দশমিক ৮৭ লাখ মেট্রিক টন সারের চাহিদার বিপরীতে ৫১ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন সরবরাহ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১৫ দশমিক ৮৪ লাখ টন উদ্বৃত্ত থাকার কথা। অক্টোবর মাসের জন্য ৬৪ জেলার চাহিদার বিপরীতেও শতভাগ বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু মাঠের চিত্র সব জায়গায় একই নয়। বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা ডিএপি ও টিএসপিসহ কয়েক ধরনের সার নির্ধারিত দামে না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। কোথাও অনুমোদিত ডিলারের কাছে সীমিত পরিমাণে সার মিলছে, আবার কোথাও বেশি দামে অননুমোদিত বিক্রেতাদের কাছ থেকে সার কিনতে হচ্ছে। একাধিক জেলার কৃষক ও ডিলারদের সঙ্গে কথা বলে করা প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
কাগজে মজুত, মাঠে সংকট কেন?
সার সংকটের পেছনে শুধু জাতীয় মজুতের পরিমাণকে দায়ী করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। মাঠপর্যায়ে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ, ডিলারের কাছে সরবরাহ এবং কৃষকের কাছে বিক্রি প্রতিটি ধাপে কোনো একটি জায়গায় সমস্যা তৈরি হলে জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও স্থানীয় বাজারে সংকট দেখা দিতে পারে।
সরকারি একটি প্রতিবেদনে মাঠপর্যায়ে সারের প্রকৃত চাহিদা যথাযথভাবে নিরূপণ না হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এর ফলে কিছু এলাকায় চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ এবং অন্য এলাকায় তুলনামূলক বেশি সরবরাহের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এর সঙ্গে রয়েছে ডিলার পর্যায়ের অনিয়মের অভিযোগ। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি দামে সার না পেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেশি দামে বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ অতিরিক্ত চাহিদা, আতঙ্কে কেনাকাটা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যাকে সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। অর্থাৎ সংকটের প্রকৃত কারণ একক কোনো জায়গায় আটকে নেই।
পাচারের অভিযোগে বাড়ছে উদ্বেগ
সারের সংকটের সঙ্গে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে উঠেছে ভর্তুকির সার পাচারের অভিযোগ। দেশের কৃষকদের জন্য সরকারি ভর্তুকিতে সরবরাহ করা সার যদি সীমান্তপথে দেশের বাইরে চলে যায়, তাহলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় অবৈধভাবে পরিবহনের সময় এক টন সার জব্দের খবর পাওয়া গেছে। কৃষি বিভাগ ও পুলিশ যৌথভাবে ওই সার জব্দ করে। এতে ১৫ বস্তা ডিএপি ও পাঁচ বস্তা টিএসপি ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় পাচারের অভিযোগ আরও বিস্তৃত কি না, তার নির্ভরযোগ্য চিত্র পেতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের অভিযানের তথ্য, জব্দের পরিমাণ এবং মামলার হিসাব নিয়মিত প্রকাশ করা জরুরি। কারণ বিচ্ছিন্নভাবে কিছু চালান আটক হওয়া এবং একটি সংঘবদ্ধ পাচারচক্রের অস্তিত্ব—দুটি বিষয়কে একইভাবে দেখার সুযোগ নেই।
সরকারের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ
একদিকে সরকার বলছে দেশে প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে। অন্যদিকে কৃষকের অভিযোগ, সেই সার সময়মতো ও নির্ধারিত দামে তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না। এই ব্যবধানই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকার ইতোমধ্যে নতুন করে সার আমদানির অনুমোদনও দিয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর ১ লাখ ১০ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়, যার মধ্যে ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি রয়েছে। পরে ১৬ সেপ্টেম্বর বোরো মৌসুমের প্রস্তুতি হিসেবে বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে আরও ৯ দশমিক ২ লাখ টন নন-ইউরিয়া সার আমদানির অনুমোদনের খবর আসে।
তবে শুধু আমদানি বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। গুদাম থেকে ডিলার, ডিলার থেকে কৃষক পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ নজরদারির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ মজুত, অতিরিক্ত দামে বিক্রি ও পাচারের অভিযোগে দ্রুত তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
কারণ কৃষকের কাছে প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত একটাই দেশে কত টন সার মজুত আছে, সেটি নয়; তার প্রয়োজনের সময়, প্রয়োজনীয় পরিমাণ সারটি তিনি নির্ধারিত দামে পাচ্ছেন কি না। জাতীয় মজুতের পরিসংখ্যানের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এই ব্যবধান কমাতে না পারলে সার নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটবে না।













