মোহন মজুমদার: ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের ১৮ তম সম্মেলনে যোগ দিতে ইতোমধ্যে বিশ্বনেতারা ভারত পৌছেছেন। তবে দীর্ঘ সাত বছর পর ভারতের মাটিতে পা রেখেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
২০১৯ সালের পর এই প্রথম তার ভারত সফর। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে শি জিনপিংয়ের এই সফর। তবে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠকই আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহের অন্যতম প্রধান বিষয়। কারণ, ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক যে গভীর সংকটে পড়েছিল, এই সফর সেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নতুন পর্যায়ের ইঙ্গিত দিতে পারে।
শি জিনপিং সর্বশেষ ভারত সফর করেছিলেন ২০১৯ সালের অক্টোবরে। তামিলনাড়ুর মহাবলীপুরমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছিলেন তিনি। এরপর দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের অবনতি ঘটে। ২০২০ সালের জুনে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারতীয় ও চীনা সেনাদের প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর সীমান্ত উত্তেজনা তীব্র হয়। এতে অন্তত ২০ ভারতীয় ও চার চীনা সেনা নিহত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘর্ষের পর কূটনৈতিক যোগাযোগ, বিনিয়োগ ও মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগসহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে সম্পর্ক কঠিন হয়ে পড়ে।
গালওয়ানের পর কেন বদলে গেল সম্পর্ক?
গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করে। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগও কমে যায়। একই সময়ে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি বরাবর সেনা মোতায়েন নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে উত্তেজনা চলতে থাকে।
তবে ২০২৪ সালের শেষ দিকে পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের আভাস দেখা যায়। ওই বছর অক্টোবরে সীমান্তে টহল ও সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছায়। এরপর সীমান্ত পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু এবং ব্যবসায়িক ভিসা সহজ করার মতো পদক্ষেপও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার অংশ হয়ে ওঠে।
তাহলে এখন কেন দিল্লিতে শি?
বিশ্লেষকদের কাছে শি জিনপিংয়ের এবারের সফরকে শুধু ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং ভারত ও চীনের মধ্যে কয়েক বছর ধরে জমে থাকা উত্তেজনা কমিয়ে সম্পর্ককে একটি নিয়ন্ত্রিত ও বাস্তববাদী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নয়াদিল্লিতে মোদি ও শির বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ভারত-চীন বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা, বাজারে প্রবেশাধিকার, চীনা বিনিয়োগ এবং ভিসা সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দুই দেশের মধ্যে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক সংলাপ জোরদারের বিষয়ও সামনে এসেছে।
চীনের জন্যও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার এবং চীনের সঙ্গে তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ভারতও চীনের সঙ্গে উত্তেজনা কমিয়ে অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাস্তব স্বার্থগুলো এগিয়ে নিতে আগ্রহী। তবে নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ে নয়াদিল্লির সতর্কতা এখনো রয়েছে।
শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, নজর ব্রিকসেও
শির সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্রিকস। ভারত এবার সম্মেলনের আয়োজক। চীন ও ভারত দুই দেশই এই জোটের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্যদের মধ্যে রয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় সংস্কারের মতো বিষয় সম্মেলনের আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীন ও ভারতের সম্পর্ক, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও ব্রিকসের আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে শি জিনপিংয়ের ভারত সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সীমান্ত বিরোধ এখনো পুরোপুরি মীমাংসিত হয়নি। সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি, বাণিজ্য ঘাটতি, চীনের পাকিস্তান-সম্পর্ক এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি—সবই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
ফলে সাত বছর পর শির দিল্লি সফরকে সবচেয়ে বেশি দেখা হচ্ছে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে। ২০১৯ সালের পর যে সম্পর্ক গালওয়ান সংঘর্ষের ধাক্কায় প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল, ২০২৬ সালে সেটি ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। মোদি-শি বৈঠক সেই পরিবর্তনকে কতটা এগিয়ে নিতে পারে, সেটিই এখন ভারত, চীন এবং আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম প্রধান আগ্রহের বিষয়।
ব্লগার আনাস্তাসিয়া গোলিয়াকোভা
আনাস্তাসিয়া গোলিয়াকোভা (Anastasia Golyakova) হলেন রুশ ব্লগার এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। তিনি দীর্ঘদিন ধরে BRICS নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করেন। থিংক ব্রিকস (Think BRICS)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।
গোলিয়াকোভা বলেন, ২০১৯ সালের পর শি জিনপিং ভারতে না এলেও ভারত ও চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় যুক্ত ছিলেন। তাঁর মন্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশের নেতাদের ধারাবাহিক যোগাযোগ সম্পর্ককে নতুন দিকে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভারত ও চীনের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও উন্নত হবে এবং তা নতুন একটি পর্যায়ে পৌঁছাবে।













