জয়শ্রী রানী: স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নতুন কৌশলে এগোতে চাইছে বিএনপি। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ার প্রেক্ষাপটে সরাসরি দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার বদলে যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থীদের নিয়ে সমন্বিতভাবে মাঠে থাকার পরিকল্পনা করছে দলটি। একই সঙ্গে একাধিক নেতা একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় প্রার্থী বাছাইয়েও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে একাধিক মত সামনে এসেছে। কোথাও দলীয়ভাবে প্রার্থী ঠিক করার পক্ষে মত রয়েছে, আবার কোথাও স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। ফলে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি স্থানীয় নেতাদের মতামতও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিএনপির নতুন কৌশলের অন্যতম দিক হচ্ছে একই পদে একাধিক দলীয় নেতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমানো। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় দলীয় পরিচয়ের বাইরে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক অবস্থান এবং স্থানীয় সামাজিক সম্পর্ক ভোটের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে নির্বাচনের আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় পর্যায়ের অবস্থান পর্যালোচনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
দলটির জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী। জাতীয় নির্বাচন বা দলীয় প্রতীকের নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক না থাকায় একই দলের একাধিক নেতা স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন। এতে ভোট বিভাজনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিএনপি তাই আগেভাগেই এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা ভাবছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জুলাই মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিএনপির পক্ষ থেকে স্থানীয় নির্বাচনে ‘একক’ প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছিল। অর্থাৎ কোনো এলাকায় দলের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকলে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একজনকে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে। এর লক্ষ্য হবে দলীয় সমর্থকদের ভোট এক জায়গায় ধরে রাখা।
এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিএনপি জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি তৃণমূল সংগঠন শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবেও দেখছে। দীর্ঘদিন পর স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় দলের নেতাকর্মীরা সক্রিয় হলে সাংগঠনিক যোগাযোগ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা ও অন্যান্য স্থানীয় সরকার কাঠামোয় দলের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে প্রার্থী বাছাই নিয়ে দলের ভেতরে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক নেতার নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব থাকায় কেন্দ্রের পছন্দের প্রার্থীকে সবাই মেনে নেবেন কি না, সেটিও বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে কোনো আসনে একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী থাকলে সমঝোতা করা কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের সময়সূচি ও নির্বাচন পদ্ধতির ওপরও বিএনপির কৌশল নির্ভর করবে। স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যেও আলাদা প্রস্তুতি চলছে। জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলোও স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পরিকল্পনা করছে। ফলে ভোটের মাঠে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন, একক প্রার্থীকে সমর্থন, ভোট বিভাজন ঠেকানো এবং বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ন্ত্রণ। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্র ও তৃণমূলের মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর হয় এবং নির্বাচনের মাঠে এই কৌশল দলটির জন্য কতটা ফলপ্রসূ হয়।













