নিজস্ব প্রতিবেদক, নাবিলা কবির: নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা অনিশ্চয়তা: তালেবান শাসনের পাঁচ বছর।
আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের ইতিমধ্যেই পাঁচ বছর পেরিয়ে গেল।
২০২১ সালের আগস্টে ক্ষমতা দখলের পর থেকে দেশটি এক দীর্ঘ ও জটিল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছে।
এই পাঁচ বছরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বড় এবং ইতিবাচক দৃশ্যমান পরিবর্তনটি এসেছে নিরাপত্তায়।
দশকের পর দশক ধরে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ, বোমা হামলা আর বারুদের গন্ধ পেছনে ফেলে আজ দেশটির অনেক অঞ্চলেই এক তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে।
সাধারণ মানুষ ও ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা এখন অন্তত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছেন এই ভেবে যে, অন্তত দিনের আলোয় বা গভীর রাতে তাদের আর বড় কোনো সহিংসতার আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে না।
কিন্তু এই আপাত নিরাপত্তার চাদরের আড়ালে ক্রমেই ঘনীভূত হয়ে উঠেছে এক গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট।
দেশের একটি বড় অংশের মানুষের উপলব্ধি হলো, কেবল নিরাপত্তা দিয়ে তো আর পেট চলে না।
জীবিকা নির্বাহের পথগুলো দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসায় সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম বড় বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রায় পুরোপুরি বন্ধ থাকা এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হওয়ায় বেকারত্ব আজ আফগানিস্তানের অন্যতম প্রধান জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।
বিশেষ করে তরুণ সমাজ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে আটকে পড়েছে।
এর চেয়েও মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক দিকটি লুকিয়ে আছে দেশের শিক্ষা খাতে।
তালেবান সরকার ক্ষমতায় বসার পর থেকেই নারী শিক্ষার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জিইয়ে রেখেছে।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দরজাও তরুণীদের জন্য চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে দেশের লক্ষাধিক মেধাবী ও স্বপ্নবান ছাত্রী জোরপূর্বক তাদের পড়াশোনা থেকে ছিটকে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে শুরু করে খোদ দেশের ভেতরকার সচেতন নাগরিক সমাজ বারবার
এই অমানবিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি।
শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এই বিশাল তরুণী সমাজ কেবল নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন ও স্বপ্ন হারাচ্ছে না, বরং গোটা দেশের চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা
এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ওপরও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
বিশ্লেষকদের জোরালো মত হলো, তালেবান প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় এবং কঠিন পরীক্ষা হলো দেশের অভ্যন্তরীণ
অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা।
কেবল অস্ত্র সংবরণ বা অপরাধ দমন করে কখনোই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
যতদিন না সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোবিশেষ করে মানসম্মত শিক্ষা এবং কাজের ন্যূনতম সুযোগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে, ততদিন আফগানিস্তানের এই তথাকথিত স্থিতিশীলতা অত্যন্ত ঠুনকো ও কাচের মতো ভঙ্গুর হয়েই থাকবে।
আজকের আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ এক অদ্ভুত ও মর্মান্তিক মানসিক দ্বন্দ্বে নিমজ্জিত।
একদিকে বোমা বিস্ফোরণের ভয় না থাকার এক ধরণের মানসিক স্বস্তি, আর অন্যদিকে পেটের ক্ষুধার তীব্র জ্বালা আর ভবিষ্যৎহীনতার ঘুটঘুটে অন্ধকার।
তালেবান শাসনের এই পাঁচ বছর পূর্তির সন্ধিক্ষণে আফগান নাগরিকদের বুকজুড়ে কেবল একটাই নীরব আকুতি নিরাপত্তার এই স্বস্তির পাশাপাশি তাদের জীবনে যেন দ্রুত ফিরে আসে শিক্ষার আলো এবং বেঁচে থাকার মতো কাজের সম্মানজনক সুযোগ।
-প্রেসপয়েন্টবিডি/আন্তর্জাতিক













