ব্রিকস কী? ভারতের সভাপতিত্ব ও ২০২৬ সালের নতুন এজেন্ডা

প্রেসপয়েন্ট বিডি

প্রকাশ :আগস্ট ৫, ২০২৬

ব্রিকস কী? সদস্য দেশ, ভারতের সভাপতিত্ব ও ২০২৬ সালের নতুন এজেন্ডা

নিজস্ব প্রতিবেদক: নাবিলা কবির: ব্রিকস কী? সদস্য দেশ, ভারতের সভাপতিত্ব ও ২০২৬ সালের নতুন এজেন্ডা।

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক জোট সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে,

তার মধ্যে অন্যতম হলো ব্রিকস (BRICS)। BRICS

বিশ্ব অর্থনীতিতে পশ্চিমা দেশগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য এবং মার্কিন ডলারের

ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা হ্রাস করে একটি বহুমুখী (Multipolar) বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই জোটটি আত্মপ্রকাশ করে।

বর্তমান সময়ে উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর এই মিলনমেলা বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ব্রিকস (BRICS) কী এবং কীভাবে এর উৎপত্তি?

ব্রিকস (BRICS) মূলত বিশ্বের প্রধান উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তঃসরকারি জোট।

এই জোটটি বিশ্ব অর্থনীতিতে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে এবং তাদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে।

জোটের নামকরণ ও ইতিহাস

‘BRIC’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন বিখ্যাত মার্কিন বিনিয়োগকারী ব্যাংক ‘গোল্ডম্যান স্যাক্স’-এর প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জিম ও'নিল (Jim O'Neill)।

২০০১ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে,

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত এবং চীন এই চারটি দেশ ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হবে।

এই চারটি দেশের নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে গঠিত হয় BRIC।

পরবর্তীতে ২০০৬ সালে এই চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে এক বৈঠকে মিলিত হন।

এর ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বিআরআইসি (BRIC) শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

২০১০ সালের ডিসেম্বরে আফ্রিকান মহাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি দক্ষিণ আফ্রিকা এই জোটে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পায়।

২০১১ সালে চীন সফরকালে দক্ষিণ আফ্রিকা আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দেয় এবং জোটের নামটি পরিবর্তিত হয়ে হয় BRICS।

ব্রিকসের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

ব্রিকস গঠনের পেছনে একাধিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য কাজ করেছে।

প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:

১. আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার: বিশ্ব ব্যাংক (World Bank) এবং

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) মতো পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও ভোটাধিকার বৃদ্ধি করা।

২. বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের (USD) আধিপত্য বা 'ডি-ডলারাইজেশন'

কমিয়ে সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন বৃদ্ধি করা।

৩. টেকসই উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণ: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা।

৪. বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা: সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিনিয়োগ, শুল্ক সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত বিনিময় বৃদ্ধি করা।

ব্রিকসের নতুন ও পুরাতন সদস্য দেশসমূহ

প্রাথমিকভাবে ৫টি দেশ নিয়ে গঠিত হলেও, ২০২৪ সালে জোটের ব্যাপ্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মূল ৫টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশ (Original Members):

  • ১. ব্রাজিল (Brazil): দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সমৃদ্ধ উৎস।
  • ২. রাশিয়া (Russia): বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি শক্তি (তেল ও গ্যাস) এবং সামরিক শক্তিধর দেশ।
  • ৩. ভারত (India): বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ এবং দ্রুত বর্ধনশীল বিশাল অর্থনীতির দেশ।
  • ৪. চীন (China): বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক উৎপাদন খাতের প্রধান হাব।
  • ৫. দক্ষিণ আফ্রিকা (South Africa): আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে উন্নত ও শিল্পোন্নত অর্থনীতি।

ব্রিকস প্লাস (BRICS Expansion):

২০২৩ সালের আগস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত ১৫তম শীর্ষ সম্মেলনে জোটটি সম্প্রসারণের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আরও নতুন কয়েকটি দেশ এই জোটে যোগ দেয়। নতুন যুক্ত হওয়া পূর্ণাঙ্গ সদস্য দেশগুলো হলো:

  • মিশর (Egypt)
  • ইথিওপিয়া (Ethiopia)
  • ইরান (Iran)
  • সংযুক্ত আরব আমিরাত (United Arab Emirates - UAE)

(নোট: আর্জেন্টিনা ও সৌদি আরবকে জোটে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হলেও রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে তারা সদস্যপদ স্থগিত বা পর্যবেক্ষণে রেখেছে।)

বর্তমান এই বর্ধিত রূপকে প্রায়শই "BRICS Plus" বা ব্রিকস প্লাস নামে অভিহিত করা হয়। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫% এবং বৈশ্বিক জিডিপির (পিপিপি অনুযায়ী) প্রায় ৩৬% এখন এই জোটের অন্তর্ভুক্ত।

নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB): ব্রিকসের নিজস্ব ব্যাংক

বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ-এর বিকল্প হিসেবে ২০১৪ সালে ব্রাজিলের ফোর্তালেজাতে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিকস দেশগুলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (New Development Bank - NDB) প্রতিষ্ঠা করে।

এর সদর দফতর চীনের সাংহাই শহরে অবস্থিত।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিদ্যুৎ, পরিবহন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নগর উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত অর্থায়ন করাই এর কাজ। বাংলাদেশ ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এনডিবি-র (NDB) সদস্যপদ গ্রহণ করে।

এবারের ব্রিকস এজেন্ডা (Current Agendas of BRICS)

সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে ব্রিকসের আলোচনায় আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে।

এবারের ব্রিকস সম্মেলনের প্রধান প্রধান এজেন্ডা ও আলোচনার বিষয়বস্তু নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ডি-ডলারাইজেশন ও স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন (De-Dollarization)

এবারের ব্রিকসের সবচেয়ে বড় ও আলোচিত এজেন্ডা হলো বৈশ্বিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো।

ব্রিকস সদস্য দেশগুলো এখন নিজেদের মধ্যে নিজস্ব স্থানীয় মুদ্রা (যেমন: রুপি, ইউয়ান, রিয়েল, রুবেল)

ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা করতে উৎসাহিত করছে।

এমনকি ব্রিকসের একটি নিজস্ব যৌথ ডিজিটাল মুদ্রা বা সাধারণ পে-পয়েন্ট (BRICS Pay) তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও গভীরভাবে আলোচনা চলছে।

২. আন্তর্জাতিক বন্ড ও আর্থিক নিরাপত্তা নেট তৈরি

পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে নিজেদের অর্থনীতিকে মুক্ত রাখতে ব্রিকস একটি নিরাপদ

ও স্বাধীন আন্তঃব্যাংক বার্তা প্রেরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, যা পশ্চিমা পরিচালিত 'SWIFT' ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।

৩. বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার (Global Governance Reform)

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC), বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO), বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ-এ বৈশ্বিক দক্ষিণের (Global South) দেশগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি তোলা এবারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা।

৪. অংশীদার দেশ' (Partner Country)

নতুন চার সদস্য অন্তর্ভুক্তির পর, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, আলজেরিয়া এবং তিউনিসিয়ার মতো আরও বহু দেশ ব্রিকসে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।

এবারের এজেন্ডায় নতুন দেশগুলোকে কীভাবে 'অংশীদার দেশ' (Partner Country) হিসেবে ধাপে ধাপে যুক্ত করা যায়, তার জন্য একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে।

৫. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মতো উদীয়মান প্রযুক্তির ঝুঁকি ও সম্ভাবনা নিয়ে যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন শুধু উন্নত বিশ্ব বা নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রযুক্তি জায়ান্টের হাতে কুক্ষিগত না থাকে,

তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ নীতি প্রণয়ন করা এবারের আলোচনার বিষয়।

৬. টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু অর্থায়ন

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায়, ব্রিকস নিজেদের উদ্যোগে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি

এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি (Green Energy) খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির এজেন্ডা নির্ধারণ করেছে।

বিশ্বের অর্থনৈতিক ভারসাম্য এখন পশ্চিম থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে ঝুঁকছে, আর এই পরিবর্তনের অগ্রভাগে রয়েছে ব্রিকস।

পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একচেটিয়া প্রভাব চ্যালেঞ্জ করে বিশ্ব বাণিজ্য ও রাজনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার ক্ষেত্রে ব্রিকসের ভূমিকা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নতুন সদস্য গ্রহণ এবং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের মতো

সুদূরপ্রসারী এজেন্ডা বাস্তবায়িত হলে, আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকস যে একটি চালিকাশক্তি হবে—তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

-প্রেসপয়েন্টবিডি/আন্তর্জাতিক

আরো পড়ুন..... Claude AI বনাম ChatGPT: ২০২৬ সালের সেরা এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট কোনটি?

Google AdSense কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

বিশ্বের সবচেয়ে বড় মরুভূমি যেখানে নেই বালু