নিজস্ব প্রতিবেদক: অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা: বাংলাদেশের অবস্থান।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মারপ্যাঁচ এবং কূটনীতির খেলায় 'অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা' বা 'ইকোনমিক স্যাংশনস' (Economic Sanctions) শব্দটা ইদানীং আমাদের কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ
আজ প্রযুক্তির যুগে রণক্ষেত্রে না গিয়েও কোনো দেশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কীভাবে তাকে শিক্ষা দেওয়া যায়,
তার প্রধান হাতিয়ারই হলো এই অর্থনৈতিক অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা।
এক ফোঁটা রক্ত না ফেলে কেবল অর্থনীতির কলকাঠি নেড়ে আড়ালে বসেই একটি আস্ত দেশের চাকা অচল করে দেওয়া সম্ভব।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আসলে কী বস্তু?
কোনো পরাশক্তি বা বৈশ্বিক সংস্থা যখন অন্য কোনো দেশের চালচলন পছন্দ করতে পারে না
কিংবা নিজেদের কথা মানাতে বাধ্য করতে চায় তখন তারা সেই দেশের ওপর একধরনের অর্থনৈতিক তালা ঝুলিয়ে দেয়।
নিষেধাজ্ঞা অনেক রকম রূপ নিতে পারে
বাণিজ্য বন্ধ করা: "তোমার দেশের তৈরি কোনো পণ্য আমরা কিনব না, আর আমাদের কোনো জিনিসও তোমাদের কাছে বেচব না।"
টাকা-পয়সা আটকে দেওয়া (Asset Freeze): আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোতে রাখা সংশ্লিষ্ট দেশের
বা শীর্ষ কোনো নেতার জমানো অর্থ ফ্রিজ করে ফেলা, যাতে এক আনা পয়সাও তারা তুলতে না পারে।
আর্থিক লেনদেনে লাল বাতি: ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পথ বন্ধ করে দেওয়া। যেমন সুইফট' (SWIFT) সিস্টেম থেকে বাদ দেওয়া।
এর মানে আন্তর্জাতিক বাজারে এক পয়সা পাঠানো বা আনাও পাহাড়সম কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা: নির্দিষ্ট কোনো নেতার জন্য বিদেশি দরজায় "প্রবেশ নিষেধ" সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া।
সাধারণত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, পরমাণু অস্ত্রের দৌড় থামানো কিংবা মানবাধিকার রক্ষার দোহাই দিয়েই বিশ্ব মোড়লরা এই কাজটা করে থাকে।
তেমনি কোনো দেশের সরকারকে টাইট দিতে গিয়ে বলির পাঁঠা হয় সেখানকার সাধারণ জনগণ। অন্ন-বস্ত্র-ওষুধের সংকটে পড়ে জীবন
বাংলাদেশের সাথে কোন দেশের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আছে?

আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হলো "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়।" কিন্তু
বিশ্বরাজনীতির এই ঘুঘুর ফাঁদে বাংলাদেশ কতটা পড়েছে তা এক বিরাট প্রশ্ন...
দেশের ওপর ঢালাও কোনো নিষেধাজ্ঞা কি আছে?
না, নেই।
বিশ্বের কোনো পরাশক্তি বা আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন—জাতিসংঘ বা ইউএস) বাংলাদেশের ওপর কোনো ধরনের সর্বাত্মক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (Comprehensive Sanctions) জারি করেনি।
আমাদের দেশের তৈরি পোশাক থেকে শুরু করে মাছ-সবজি সবই অবাধে বিদেশে যাচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগও আসছে। অর্থাৎ, অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এখনও কোনো খবর কিনারে এসে পড়েনি।
ব্যক্তি বা সংস্থাকেন্দ্রিক বাধা:
রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ওপর পুরো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও ২০২১ সালে একটু আঁচ লেগেছিল।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দেশের বিশেষ বাহিনী র্যাব (RAB) এবং এর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা (Targeted Sanctions) দিয়েছিল।
এটি মূলত ব্যক্তি বা সংস্থাকেন্দ্রিক একটা আইনি ব্যবস্থা, যার কারণে তাদের সম্পদ জব্দ বা মার্কিন মুলুকে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকে।
কিন্তু পুরো দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে এর কোনো প্রত্যক্ষ বিরোধ নেই।
পরোক্ষ ধাক্কা সরাসরি বাংলাদেশের গায়ে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও চাপ রয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: রাশিয়া যখন ইউক্রেনে হামলা চালাল, তখন পশ্চিমারা রাশিয়ার ব্যাংকিং খাতের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা বসাল। আর এতে বিপদে পড়ল বাংলাদেশ।
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের টাকা লেনদেন করা নিয়ে আমরা বড় ধরনের অথৈ জলে পড়ে গেলাম।
তাছাড়া রাশিয়া থেকে সস্তায় গম ও সার আনাও বেশ ঝক্কির ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল।
জ্বালানি তেলের বাজার: যেসব দেশের ওপর তেল বিক্রির বারণ আছে, তাদের কাছ থেকে কম দামে তেল কেনার সুবিধা বাংলাদেশ নিতে পারে না।
ফলস্বরূপ, দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে আর মধ্যবিত্তের পকেটে টান পড়ে।
শেষ কথা
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা হলো আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক বিষাক্ত চাল।
সৌভাগ্যবশত, বাংলাদেশ তার চমৎকার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির কারণে সরাসরি কোনো বড় অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়েনি।
তবে বিশ্বায়নের এই যুগে নিজের ঘরে শান্তিতে বসে থাকলেও দূর দেশের ঝড়ের ঝাপটা এড়ানো দায়।
তাই ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকট সামাল দিতে হলে আমাদের বুঝে-শুনে কদম ফেলতে হবে, যাতে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার ধাক্কাতেও আমাদের অর্থনীতির ভিত একটুও টলে না যায়।
-প্রেসপয়েন্টবিডি/আন্তর্জাতিক













