ফিরে দেখা ২০২৪: রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান ও একটি নতুন বাংলাদেশের সূর্যোদয়

প্রেসপয়েন্ট বিডি

প্রকাশ :আগস্ট ৫, ২০২৬

ফিরে দেখা জুলাই ২০২৪: রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান ও একটি নতুন বাংলাদেশের সূর্যোদয়

নিজস্ব প্রতিবেদক: নাবিলা কবির: ফিরে দেখা জুলাই ২০২৪: রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান ও একটি নতুন বাংলাদেশের সূর্যোদয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে জুলাই ২০২৪ কেবল একটি নির্দিষ্ট মাসের নাম নয়; এটি গণআকাঙ্ক্ষা, আত্মত্যাগ এবং ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার এক চিরভাস্বর প্রতীক। রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান

স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৩ বছরের ইতিহাসে জুলাই মাসটি নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে, যা এ দেশের ছাত্র-জনতার অদম্য সাহস ও রক্তস্নাত বিপ্লবের গল্প বলে।

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে যা রূপ নিয়েছিল স্বৈরাচারবিরোধী এক দোর্দণ্ড গণঅভ্যুত্থানে।

২০২৪ সালের জুলাই মাস আমাদের শিখিয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যখন তরুণ সমাজ জেগে ওঠে, তখন কোনো শাসকই অমর হতে পারে না।

ঘটনাপ্রবাহের সূচনা হয়েছিল জুন মাসের শেষ দিকে, যখন উচ্চ আদালত সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত দেয়।

কিন্তু জুলাইয়ের শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাধারণ শিক্ষার্থীরা এর বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শুরু হওয়া এই আন্দোলনটি প্রথমদিকে ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও অহিংস।

আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল সুস্পষ্ট সরকারি চাকুরিতে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার।

রাজপথের মিছিল, স্লোগান আর ব্লকেড কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণরা তাদের ন্যায্য দাবি বিশ্ববাসীকে জানাতে থাকে।

২০২৪ সালের জুন মাসে, যখন হাইকোর্ট ২০১৮ সালের সরকারি পরিপত্র বাতিল করে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে।

১ জুলাই থেকে 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন'-এর ব্যানারে শিক্ষার্থীরা রাজপথে কর্মসূচি ঘোষণা করে।

১ জুলাই

প্রাথমিক পর্যায়ে আন্দোলন ছিল মূলত অবরোধ ও স্মারকলিপি প্রদানের মাধ্যমে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ।

আন্দোলনকারীরা সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মেধাভিত্তিক নিয়োগের হার বাড়াতে ৫ শতাংশ কোটার প্রস্তাব দেয়।

জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে রাজপথের এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে।

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী

ও তৎকালীন সরকারি দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়, যার ফলে শত শত শিক্ষার্থী আহত হন।

পরদিন, ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশি গুলিতে নিহত হন।

একই দিনে চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আরো বেশ কয়েকজন হতাহত হন, যা পরিস্থিতিকে মারাত্মকভাবে উত্তপ্ত করে তোলে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৮ জুলাই থেকে সারাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়

এবং পরবর্তীতে ১৯ জুলাই রাত থেকে সারাদেশে কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

জুলাইয়ের ১৮ থেকে ২১ তারিখের মধ্যে ঢাকার যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, উত্তরা ও মহাখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রদর্শনকারীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ঘটে।

পরবর্তীতে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার (OHCHR) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এ সময়কালে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহারে বহু সাধারণ নাগরিক ও শিক্ষার্থী নিহত হন।

২১ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় সংশোধন করে ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে

এবং বাকি ৭ শতাংশ পদ কোটায় বরাদ্দ রাখার নির্দেশনা দেয়। কিন্তু ততদিনে আন্দোলনের মাত্রা ও দাবি পরিবর্তিত হয়ে যায়।

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও কারফিউর সময়ে ব্যাপক প্রাণহানি, গণগ্রেপ্তার

এবং দমনপীড়নের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা ৯ দফা দাবি উত্থাপন করে, যা পরবর্তীতে ৩ আগস্টে এসে 'এক দফা' বা সরকারের পদত্যাগের দাবিতে রূপান্তরিত হয়।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে অগাস্টের

প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আন্দোলনে অন্তত ৬০০ থেকে ১,০০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারান এবং ২০,০০০-এরও বেশি মানুষ আহত হন।

রক্তাক্ত জুলাইলের শহীদ

নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী, শিশু ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ছিলেন।

অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গণগ্রেপ্তার এবং হাসপাতালে রোগীদের তথ্য সংগ্রহে বাধার কারণে সঠিকভাবে ক্ষতি ও হতাহতের পরিসংখ্যান তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

সর্বশেষ, ৪ আগস্টের পর 'অসহযোগ আন্দোলন' এবং ৫ আগস্টের 'লং মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচির

মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশে ছেড়ে চলে যান।

কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; এটি একটি জাতির পুনর্জন্মের ইতিহাস।

এই জুলাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজদের মতো তরুণদের নাম, যারা স্বৈরাচারের বুলেটকে ভয় না পেয়ে হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করেছেন।

পানির বোতল হাতে নিয়ে 'কারো পানি লাগবে, পানি?' বলে চিৎকার করা মুগ্ধর সেই শেষ কথাগুলো চিরকালের জন্য এ দেশের মানুষের মনে থাকবে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসটি এভাবে কেবল এক সংস্কার আন্দোলনের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক সংস্কার ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের একটি বড় অনুঘটক হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়।

-প্রেসপয়েন্টবিডি/জাতীয়

আরো পড়ুন..... ব্রিকস কী? সদস্য দেশ, ভারতের সভাপতিত্ব ও ২০২৬ সালের নতুন এজেন্ডা